গৃহকর্মী আবিরন হত্যাকাণ্ড সৌদিতে বাংলাদেশি হত্যায় প্রথম মৃত্যুদণ্ড
-
আপডেট সময় :
মঙ্গলবার, ১৬ ফেব্রুয়ারী, ২০২১
-
৬১৪
০ বার সংবাদটি পড়া হয়েছে
অনলাইন ডেস্ক //
সৌদি আরবে বাংলাদেশি গৃহকর্মী আবিরন বেগম হত্যা মামলার প্রধান আসামি সৌদি গৃহকর্ত্রী আয়েশা আল জিজানিকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন দেশটির একটি আদালত। সৌদি আরবে কোনো বাংলাদেশিকে হত্যার ঘটনায় দেশটির আদালত প্রথমবারের মতো কারও মৃত্যুদণ্ডের রায় দিলেন। বহুল আলোচিত গৃহকর্মী আবিরন হত্যা মামলায় রোববার দেশটির রাজধানী রিয়াদের অপরাধ আদালত রায় দেন। এ ছাড়া আয়েশার স্বামী ও সন্তানকেও দণ্ড দেওয়া হয়েছে। সোমবার বাংলাদেশের প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় এবং রিয়াদে শ্রমকল্যাণ উইং এ তথ্য নিশ্চিত করেছে।
প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, গৃহকর্মী আবিরনকে ইচ্ছা করে ও সুনির্দিষ্টভাবে হত্যার দায়ে প্রধান আসামি গৃহকর্ত্রী আয়েশাকে ‘কেসাস’ (জানের বদলে জান)-এর ভিত্তিতে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন আদালত। এ ছাড়া আবিরনকে বাসার বাইরে বিভিন্ন জায়গায় কাজে পাঠানো ও চিকিৎসার ব্যবস্থা না করায় আয়েশার স্বামী গৃহকর্তা বাসেম সালেমকে তিন বছর দুই মাস কারাদণ্ড ও ৫০ হাজার সৌদি রিয়াল (১১ লাখ ২৭ হাজার টাকা) জরিমানা করা হয়েছে। সালেমের বিরুদ্ধে আলামত ধ্বংসেরও অভিযোগ করা হয়েছে। এ ছাড়া অপর আসামি আয়েশার কিশোর ছেলে ওয়ালিদ বাসেম সালেমের বিরুদ্ধে হত্যাকাণ্ডে সহযোগিতা করার প্রমাণ পাওয়া যায়নি। তবে আবিরনকে বিভিন্নভাবে অসহযোগিতা করায় তাকে সাত মাসের কিশোর সংশোধনাগারে থাকার আদেশ দেওয়া হয়েছে। রায়ের বিরুদ্ধে ৩০ দিনের মধ্যে আপিল করার সুযোগ রেখেছেন আদালত। এ রায়ের পর সৌদি আরবে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত ড. জাবেদ পাটোয়ারি সন্তোষ প্রকাশ করেন। সৌদি আরব সরকারকে তিনি ধন্যবাদ জানান। রিয়াদে বাংলাদেশ দূতাবাসের শ্রমকল্যাণ উইং বিচারকার্য ত্বরান্বিত করার ক্ষেত্রে কার্যকর ভূমিকা পালন করেছে। প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় থেকেও সব ধরনের সহযোগিতা করার কথা জানিয়েছেন প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রী ইমরান আহমদ।
জানা গেছে, খুলনার পাইকগাছার বাসিন্দা আবিরন গৃহকর্মী হিসাবে কাজ করতে ২০১৭ সালে সৌদি আরবে যান। ঢাকার একটি রিক্রুটিং এজেন্সির মাধ্যমে তিনি সেখানে যান। ২০১৯ সালের ২৪ মার্চ রিয়াদের আজিজিয়ায় গৃহকর্ত্রীর নির্যাতনে আবিরন মারা যান। তার মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনা নিয়ে নানা জটিলতা দেখা দেয়। তবে ব্র্যাকের অভিবাসন কর্মসূচির সহায়তায় হত্যাকাণ্ডের সাত মাস পর ২০১৯ সালের ১৪ অক্টোবর তার মরদেহ দেশে আনা হয়। তার মৃত্যুসনদে মৃত্যুর কারণ হিসাবে ‘মার্ডার (হত্যা)’ লেখা হয়।
আবিরনের লাশ দেশে আসা নিয়ে সে সময় বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। প্রতিবেদন আমলে নিয়ে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন স্বতঃপ্রণোদিত (সুয়োমোটো) হয়ে এক সদস্যবিশিষ্ট তথ্যানুসন্ধান কমিটি গঠন করে। কমিশনের অবৈতনিক সদস্য নমিতা হালদারকে তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয়। মানবাধিকার কমিশনের তদন্ত প্রতিবেদন অনুযায়ী-পেটানো ও গরম পানিতে ঝলসে দেওয়াসহ বিভিন্ন নির্যাতন করে আবিরনকে (৪০) হত্যা করা হয়। সে সময় আবিরনের বোন রেশমা খাতুন জানান, আবিরন যে বাসায় কাজ করতেন সেখানে আটজন পুরুষ থাকতেন। তারা তাকে যৌন নির্যাতনও করেছে। খাবার খেতে না দেওয়া, গ্রিলে মাথা ঠুকে দেওয়াসহ নানা নির্যাতনও করা হয়েছে। দুই বছরের বেশি সময় আবিরন সেখানে কাজ করলেও তার পরিবার মাত্র ১৬ হাজার টাকা পেয়েছে। দালাল চক্রসহ অন্যরা তার বেতনের টাকা আত্মসাৎ করেছে। সন্তান না হওয়ায় স্বামী তাড়িয়ে দিলে আবিরন বাবার বাড়িতে চলে আসেন। বোনদের পড়াশোনা ও পরিবারের খরচ জোগাতে তিনি বিদেশ যান। ছয় বোনের মধ্যে আবিরন ছিলেন মেজ।
ব্র্যাকের অভিবাসন কর্মসূচির তথ্য মতে, পাঁচ বছরে পাঁচ শতাধিক নারী শ্রমিকের অপমৃত্যু হয়েছে। সৌদি আরবেই বেশির ভাগ গৃহকর্মীর মৃত্যু হয়েছে। কিন্তু এসব অপমৃত্যুর ঘটনার কোনোটিই আদালত পর্যন্ত গড়ায়নি। এবারই প্রথম কোনো বাংলাদেশি হত্যার ঘটনায় রায় পাওয়া গেল। মানবাধিকারকর্মী ও নারী অভিবাসন নিয়ে কাজ করা ব্যক্তিরা জানান, সৌদি আরবে বাংলাদেশের শ্রমিক নির্যাতন বা হত্যার শিকার হওয়ার পর রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে আনুষ্ঠানিক বিচার শুরু ও রায় হওয়ার নজির কম।
নিউজটি আপনার বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুন
এই ক্যাটাগরির আরো সংবাদ
Leave a Reply