নিউজ ডেস্কঃ
গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র কাকে বলে এবং সেটি কীভাবে গঠন করতে হয়, তা নিয়ে সম্যক ধারণা রাখে এ দেশের কতজন শিক্ষিত নাগরিক? বাদ দেই সম্যক ধারণা রাখার কথা, মোটামুটি প্রাথমিক ধারণা রাখে কতজন?
গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র কাকে বলে এবং সেটি কীভাবে গঠন করতে হয়, তা নিয়ে সম্যক ধারণা রাখে এ দেশের কতজন শিক্ষিত নাগরিক? বাদ দেই সম্যক ধারণা রাখার কথা, মোটামুটি প্রাথমিক ধারণা রাখে কতজন?
‘শিক্ষিত মানুষ’ বলে আমরা যাদের বোঝাই, তাদের সবারই কিছু সার্টিফিকেট আছে, এর বেশি কিছু জ্ঞান অনেক ক্ষেত্রেই তাদের মধ্যে থাকে না। তাই নাগরিকরা অনেক সময় বুঝতে ভুল করেন ভাবাবেগ দিয়ে রাষ্ট্র গঠন করা যায় না। তাই নানা ঘটনায় নাগরিকদের ভাবাবেগপূর্ণ আচরণ আমাদের দেশে স্বাভাবিক ঘটনা। কিন্তু একটা রাষ্ট্রের বেসিক যদি না বুঝে থাকে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান, তাহলে সেটা সেই জাতির জন্য এক কথায় মর্মান্তিক।
দুটো ঘটনার ওপরে ভিত্তি করে এ আলোচনা। কারও কারও কাছে ঘটনা দুটোকে হালকা মনে হতে পারে; কিন্তু আমি মোটেও তা বিশ্বাস করি না, বরং মনে করি এগুলো সিরিয়াস আলোচনার দাবি রাখে। কারণ এ দুটো ঘটনা আমাদের রাষ্ট্র গঠনের গোড়ার কিছু ধারণার পরিপন্থী। বিষয়টি তলিয়ে দেখার আগে ঘটনা দুটি জেনে নেওয়া যাক। প্রথম ঘটনাটি দিনাজপুরের হাকিমপুর পৌরসভার। সেখানে কী ঘটেছে জেনে নেওয়া যাক পৌর মেয়র জামিল হোসেন চলন্তের জবানিতে। কয়েক দিন আগে একটি নিউজ পোর্টালকে তিনি বলেন-‘‘করোনার টিকা গ্রহণ না করার কারণে আজ মঙ্গলবার থেকে কর্তব্যরত পৌর কর্মচারীদের বেতন সাময়িকভাবে বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। যারা টিকা নিচ্ছেন শুধু তাদের বেতন দেওয়া হচ্ছে। এ কার্যক্রম আমাদের চলমান থাকবে। তবে গণটিকা দেওয়ার পরও যদি পৌর সেবাপ্রার্থীরা টিকা কার্ড প্রদর্শন না করে সেবা নিতে আসেন, তাহলে তাদের সব ধরনের সেবা দেওয়াও বন্ধ রাখা হবে। টিকার কার্ড প্রদর্শন করলে তাদের সেবা দেওয়া হবে। এজন্য আমরা এখন থেকে করোনার ‘নো সার্টিফিকেট নো সার্ভিস’ নামের সেবাটি চালু করেছি।’’
দ্বিতীয় ঘটনাটি ঘটেছে অ্যাটর্নি জেনারেল অফিসে। এ অফিসের প্রশাসনিক কর্মকর্তা মো. নাসির উদ্দিন স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তি প্রকাশিত হয়েছে কয়েক দিন আগে। তাতে বলা হয়েছে, ‘অ্যাটর্নি জেনারেল অফিসের যেসব কর্মকর্তা ও কর্মচারী এখনো করোনার টিকা গ্রহণ করেননি তাদেরকে নিবন্ধন সম্পন্ন করে আগামী ১৬ আগস্টের মধ্যে টিকা গ্রহণ করার জন্য নির্দেশ প্রদান করা হলো।’ ‘অ্যাটর্নি জেনারেল অফিসের সব কর্মকর্তা-কর্মচারী ভ্যাকসিন গ্রহণ সম্পর্কিত টিকা কার্ড বা টিকা গ্রহণের সনদ আগামী ২২ আগস্ট থেকে ৩১ আগস্টের মধ্যে প্রশাসনিক শাখায় জমা প্রদান করবেন’ বলেও নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। একইসঙ্গে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে যুক্তিসঙ্গত কারণ ছাড়া ভ্যাকসিন গ্রহণ না করলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিরুদ্ধে বেতন বন্ধসহ প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে বলেও বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে।
একটা পৌরসভার নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি টিকা না দেওয়ার ক্ষেত্রে যে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, সেটা কি তিনি কোনোভাবে নিতে পারেন? এর চেয়েও বড় কথা, একই ধরনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে রাষ্ট্রের (সরকারের নয়) সর্বোচ্চ আইন কর্মকর্তার অফিস! সংক্রামক রোগ এবং মহামারি নিয়ন্ত্রণের জন্য বাংলাদেশে একটি আইন আছে-সংক্রামক রোগ (প্রতিরোধ, নিয়ন্ত্রণ ও নির্মূল) আইন, ২০১৮। আইনটি করা পর্যন্ত প্রাদুর্ভাব হওয়া ২৩টি সংক্রামক রোগের উল্লেখ করে বলা হয়েছে, সরকার গেজেট বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে আরও যে কোনো রোগকে এর অন্তর্ভুক্ত করতে পারবে। সেই অন্তর্ভুক্তকরণের মাধ্যমে সরকার নতুন রোগের ক্ষেত্রে মহামারি নিয়ন্ত্রণের জন্য এ আইনের বিধানাবলি প্রয়োগ করতে পারবে।
প্রায় সব আইনের মতো এ আইনের অধীনে কতগুলো অপরাধ আছে, যেগুলোর জন্য শাস্তির ব্যবস্থা রয়েছে। এ আইনে তিনটি ক্ষেত্রে ফৌজদারি অপরাধের কথা বলা হয়েছে এবং এগুলোর ক্ষেত্রে দেশের প্রচলিত ফৌজদারি কার্যবিধি প্রয়োগ করা হবে। দেখা যাক আইনটির অধীনে কোন কোন অপরাধের কথা বলা হয়েছে। ২৪ ধারায় আছে, যদি কোনো ব্যক্তি কোনো সংক্রামক ব্যাধি বিস্তার করেন বা বিস্তারে সাহায্য করেন কিংবা সেটা গোপন করার মাধ্যমে অন্যের সংক্রমিত হওয়ার কারণ হন, তাহলে সেটা অপরাধ। ২৫ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, সংক্রামক ব্যাধি কিংবা মহামারি নিয়ন্ত্রণের কাজে নিয়োজিত যে কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারীকে তার দায়িত্ব পালনে বাধা দেওয়াটা অপরাধ। ২৬ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, কেউ কোনো সংক্রামক ব্যাধির সঠিক তথ্য জানার পরও বিকৃত বা মিথ্যা তথ্য দেওয়াটা অপরাধ। এসব ক্ষেত্রে কী শাস্তি হবে, অন্যসব আইনের মতো সংশ্লিষ্ট ধারাগুলোতে সেটা বলেও দেওয়া আছে। এ আইনে অপরাধের ধরন অনুযায়ী ২ মাস থেকে ৬ মাস পর্যন্ত কারাদণ্ড কিংবা ২৫ হাজার থেকে ১ লাখ টাকা পর্যন্ত অর্থদণ্ড অথবা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত করার বিধান রাখা আছে। অর্থাৎ এ আইনের অধীনে শুধু এ তিনটি ক্ষেত্রেই কারও বিরুদ্ধে ফৌজদারি অভিযোগ আনা যাবে এবং তার বিচার করা যাবে। আমরা নিশ্চয়ই বুঝতে পারছি, এ আইনের কোথাও টিকা না দেওয়াটা অপরাধ নয়। এমনকি সরকার এখনো পর্যন্ত সবাইকে বাধ্যতামূলকভাবে টিকা নিতে হবে, তেমন কোনো ঘোষণাও দেয়নি। সত্যি বলতে, সরকার এমন ঘোষণা এখন অন্তত দিতে পারে না। সরকার যদি মনে করে টিকা দেওয়াটা বাধ্যতামূলক করতে হবে এবং টিকা না নিলে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে সেক্ষেত্রে সরকারকে নতুন একটি আইন করতে হবে অথবা আলোচ্য আইনটির সঙ্গে এই বিধান অন্তর্ভুক্ত করার জন্য নতুন ধারা যুক্ত করতে হবে।
প্রশ্ন আসতেই পারে, এখন তো সংসদ চলছে না, তাহলে জরুরি পরিস্থিতিতে সরকার কী করবে? এ জরুরি পরিস্থিতির জন্যই রাষ্ট্রপতির অধ্যাদেশের বিধান রাখা আছে। মুহূর্তেই এমন একটি অধ্যাদেশ জারি করা যায় যেটা পরে সংসদ অধিবেশনে আইনের অন্তর্ভুক্ত করে নিলেই হবে।
সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত । এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা বা ছবি অনুমতি ছাড়া নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা সম্পূর্ণ বেআইনি।Design & Development : It Corner BD.Com 01711073884.
Leave a Reply