ফেরিঘাট
ফেরি বন্ধ থাকায় শিমুলিয়া ঘাটে রোববার সকাল থেকে করোনায় মৃত্যুঝুঁকি উপেক্ষা করে পারাপারের অপেক্ষায় শত শত মানুষ -শরীফ মাহমুদ
শিমুলিয়া ফেরিঘাটে মানুষ গিজগিজ করছে। তাদের হাতে, পিঠে, কাঁধে ব্যাগ, মাথায় স্যুটকেস, দাঁড়িয়ে আছেন নদীর পাড়ে। দৃষ্টি প্রসারিত পদ্মায়। প্রতীক্ষা ফেরির। একটি ফেরি ঘাটে পৌঁছামাত্র অপেক্ষমাণ মানুষ তাতে ঝাঁপিয়ে পড়ছেন। কে কার আগে উঠবেন- এ প্রতিযোগিতা চলে দীর্ঘ সময় ধরে। অধিকাংশের মুখে মাস্ক নেই। যে কয়েকজনের মুখে মাস্ক ছিল ফেরিতে উঠার ধাক্কায় পড়ে গেছে।
গা ঘেঁষে দাঁড়ানোয় উপেক্ষিত সামাজিত দূরত্ব রক্ষার বিষয়টি। এ পরিস্থিতিতে কোনো ভাবে কয়েকটি অ্যাম্বুলেন্স ও পণ্যবাহী যান উঠানো গেল ফেরিতে। দৃশ্যটি রোববার সকালের। দিনে কিছুটা স্বাভাবিক থাকলেও রাতে পাটুরিয়ার ছবি ছিল ভিন্ন। যাত্রীর চাপ ছিল বেশি। জায়গার অভাবে রোগী এবং মরদেহ নিয়ে আসা অ্যাম্বুলেন্স ও মাঝারি ট্রাকও ফেরিতে তোলা সম্ভব হয়নি। মরদেহ নিয়ে স্বজনদের ঘাটেই কেটেছে ঘণ্টার পর ঘণ্টা।
প্রায় কাছাকাছি সময়ে ঢাকার তেজগাঁও থেকে বিমানবন্দর সড়কে, মহাখালী ও বনানী এলাকায় যানজট। দীর্ঘ সময় ধরে স্থবির হয়ে আছে নগরীর ব্যস্ততম সড়কটি। এতে গণপরিবহণ হিসাবে আছে বাস, ছোট-মাঝারি ট্রাক, প্রাইভেটকার, মাইক্রোবাস, মোটরসাইকেল, দীর্ঘদিনের পুরোনো যানবাহনও আছে যানজটের দীর্ঘ লাইনে। অথচ করোনার ভয়াবহতা রোধে দেশে চলছে লকডাউন।
এ সময় জরুরি প্রয়োজন ছাড়া অন্য কোনো যানবাহন সড়কে থাকার কথা নয়। প্রায় একই দৃশ্য দেখা গেছে ঢাকায় প্রবেশ ও বের হওয়ার পথগুলোতে। এসব স্থানে বিভিন্ন ধরনের যানবাহনে যাত্রীদের ক্লান্ত-পরিশ্রান্ত চেহারা, তারা বাড়ি ফিরছেন। মাইক্রোবাস, ছোট গাড়ি, ছোট ট্রাকের পেছনে গাদাগাদি করে বসে আছেন অনেকেই। কেউ জানেন না পাশেরজন করোনার মতো প্রাণঘাতী ভাইরাসে আক্রান্ত কিনা।
আবার মোটরসাইকেলের দুপাশে ঝুলছে ব্যাগ এবং পেছনে বাচ্চাসহ মহিলা যাত্রী। এরা একই পরিবারের সদস্য। ঈদে বাড়ি যাচ্ছেন। বিভিন্ন স্থান থেকে খবর আসছে ঢাকার বাইরে চলছে দূরপাল্লার বাস। যাত্রীরা রাজধানীর বাইরে নির্দিষ্ট স্থানে পৌঁছে সেই বাসে গন্তব্যে যাচ্ছেন। অথচ এবার ঈদে কর্মস্থলেই থাকার কঠোর নির্দেশ রয়েছে। যে কারণে দূরপাল্লার বাস, ট্রেন, লঞ্চ সব বন্ধ করে লকডাউন ঘোষণা করা হয়েছে।
রাজধানীর বিভিন্ন মার্কেটে মানুষের উপচে পড়া ভিড়। ঈদের কেনাকাটার জন্য ফুটপাত থেকে শুরু করে বিভিন্ন মার্কেটে দাঁড়ানোর উপায় নেই। এসব স্থানে স্বাস্থ্যবিধির বালাই নেই। শুধু মার্কেট নয়, পাড়ার দোকান, অলিগলিতে আড্ডা, কাঁচাবাজার কোথাও তেমন বিধিনিষেধ নেই। এবার এপ্রিলের শুরুর দিকে কিছুটা ছিল। এরপর থেকে সেই আগের অবস্থা।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাঁধভাঙা জোয়ারের মতো মানুষ ঢাকা ছাড়ছেন। বাড়ি ফেরা মানুষের চাপ এবং ঈদের কেনাকাটার উত্তাপে লকডাইন উধাও হয়ে গেছে। এদের অধিকাংশই করোনায় সরকার ঘোষিত স্বাস্থ্যবিধিগুলো উপেক্ষা করছেন। ফেরিঘাট, রাজপথ, মার্কেট, পাড়া-মহল্লা, অলিগলির দোকান, কাঁচাবাজার কোথাও লকডাউন প্রায় নেই বললেই চলে। যে যার মতো চলছেন। অধিকাংশের মুখে মাস্ক নেই।
সামাজিক দূরত্ব রক্ষা করে চলছেন না। হাত ধোয়ারও বালাই নেই। স্বাস্থ্যবিধি প্রায় শতভাগ উপেক্ষিত। করোনার মতো ভাইরাসকে উপেক্ষা করেছেন জনগণ। এর ফলও তাদেরই ভোগ করতে হবে। এমন পরিস্থিতিতে করোনা সংক্রমণের তৃতীয় ঢেউয়ের আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলেন, ফেরিঘাটে পুলিশ, বিজিবি মোতায়েন করা হয়েছে।
সেখানে তারা কি করবে। শত শত মানুষকে তারা কিভাবে সামাল দেবে। ফেরি ছাড়বে কিনা, তাতে যানবাহন না মানুষ পারাপার হবে সে সিদ্ধান্ত কেন্দ্র থেকে হওয়া উচিত। ঘাটের লোকজনের পক্ষে এ সিদ্ধান্ত দেওয়া সম্ভব নয়। কর্র্তব্যরত বিজিবি সদস্যদের দায়িত্ব পালন করতে দেখা গেছে। বিভিন্ন স্থানে সরেজমিন ঘুরে এবং জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।
সরেজমিন দেখা গেছে, মহাসড়কে ঘরমুখো মানুষের বাঁধভাঙা ঢল নেমেছে। কোনো বিধিনিষেধে তাদের আটকে রাখা যাচ্ছে না। ভেঙে ভেঙে মানুষ নিজ নিজ গন্তব্যের উদ্দেশে ঢাকা ছাড়ছেন। বাসে চড়ে নির্দিষ্ট দূরত্ব পর অন্য বাস বা মাইক্রোবাস, সিএনজিচালিত অটোরিকশা, পিকআপ ও ট্রাকে চড়ে বাড়ি ফিরছেন। ঢাকার বহির্গমন পথে হেঁটেও অনেককে বাড়ি ফিরতে দেখা গেছে। বাস্তব চিত্র বলে দেয়, নামেই রয়েছে করোনার বিধিনিষেধ।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সরকারের পক্ষ থেকে নিজ নিজ অবস্থানে ঈদ করার কথা বললেও সেটা বাস্তবায়নে কর্তৃপক্ষ কঠোর না থাকায় ঘরমুখো মানুষকে আটকে রাখা যাচ্ছে না। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মানুষের চলাচল বাড়লে করোনা সংক্রমণও বাড়বে। ইতোমধ্যে করোনার ভারতীয় ভ্যারিয়েন্ট বাংলাদেশে ঢুকে পড়েছে।
এমন পরিস্থিতিতে ভাইরাসটির সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে মানুষের চলাচল সীমিত রাখা খুবই জরুরি। এ অবস্থায় করোনা সংক্রমণের তৃতীয় ঢেউয়ের আশঙ্কা করা হচ্ছে। আর সেটা ভারতীয় ভ্যারিয়েন্টের হলে আমাদের স্বাস্থ্য বিভাগের পক্ষে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব কিনা তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
সরেজমিন দেখা গেছে, রোববার শিমুলিয়া-বাংলা বাজার ফেরিঘাটে গিজগিজ করছেন হাজার হাজার মানুষ। প্রশাসনের কঠোরতার মধ্যে কয়েকটি ফেরি চলাচল করেছে। এসব যানবাহনে হাজার হাজার মানুষকে স্বাস্থ্যবিধি উপেক্ষা করে পারাপার হতে দেখা গেছে। আরিচা ফেরিঘাটে যানবাহন পারাপার বন্ধ থাকায় সেখানে মানুষের তেমন কোনো ভিড় ছিল না।
তবে বিকল্প হিসাবে ট্রলারে অনেককে পার হতে দেখা যায়। তবে রাতে যাত্রী চাপ বাড়ে। দেশের দক্ষিণাঞ্চলের মানুষ ফেরির কারণে পারাপারে বাধাগ্রস্ত হলেও উত্তরাঞ্চল, নোয়াখালী, চট্টগ্রাম, সিলেটসহ অন্যান্য এলাকা
সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত । এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা বা ছবি অনুমতি ছাড়া নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা সম্পূর্ণ বেআইনি।Design & Development : It Corner BD.Com 01711073884.
Leave a Reply