অনলাইন ডেস্কঃ
কোনো অপরাধ না করেও একের পর এক কারাবাসের ঘটনা ঘটছে। গত ৫ বছরে অন্তত শতাধিক ব্যক্তি বিনা দোষে কারাভোগের শিকার হয়েছেন।
এদের মধ্যে ৮০ বছরের বৃদ্ধ ও প্রতিবন্ধী রয়েছেন। নামের মিল, তদন্তে অনিচ্ছাকৃত বা ইচ্ছাকৃত ভুল, মিথ্যা সাক্ষ্যদান বা বিচারিক প্রক্রিয়ায় বিলম্ব হওয়া- এরকম নানা কারণে এ ধরনের ঘটনা ঘটছে।
উচ্চ আদালতের নির্দেশে এদের কেউ কেউ কারামুক্ত হলেও ক্ষতিপূরণের টাকা এখনও কেউ পাননি। বিনা দোষে কারাভোগকারী পাটকল শ্রমিক জাহালম, রাজধানীর পল্লবী থানার আরমান ও চট্টগ্রামের নিরীহ মিনু হাইকোর্টের নির্দেশে মুক্তি পেয়েছেন।
এরমধ্যে জাহালমকে ১৫ লাখ এবং আরমানকে ২০ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ দেওয়ার নির্দেশনা ছিল। কিন্তু আইনি জটিলতায় তারা ক্ষতিপূরণের টাকা পাননি। মামলা আপিল বিভাগে বিচারাধীন রয়েছে।
সম্প্রতি আইনজীবী মোহাম্মদ শিশির মনির পত্রিকায় প্রকাশিত প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে নিরপরাধ ২৬ জনের কারাভোগের তথ্য হাইকোর্টকে জানিয়েছেন। এ ছাড়াও আরও ৭০-৭৫ নিরপরাধ ব্যক্তির সাজা খাটার ঘটনা ঘটেছে বলে বিভিন্ন গণমাধ্যমে এসেছে।
৭ পুলিশ সদস্যের অবহেলায় আরমানের কারাভোগ : রাজধানীর পল্লবী থানায় মাদক মামলায় ১০ বছরের সাজাপ্রাপ্ত শাহাবুদ্দিন বিহারির পরিবর্তে প্রায় ৫ বছর ধরে কারাগারে ছিলেন নির্দোষ আরমান। বিষয়টি উচ্চ আদালতের নজরে আনলে ৩১ ডিসেম্বর আরমানকে ১ মাসের মধ্যে ২০ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ দিতে পুলিশের মহাপরিদর্শককে (আইজিপি) নির্দেশ দেওয়া হয়। এ ঘটনায় চার পুলিশ সদস্যকে চলতি দায়িত্ব থেকে প্রত্যাহারেরও আদেশ দেন আদালত। এ ছাড়া আরমানকে বেআইনি আটকের ঘটনায় দায় নিরূপণে নতুন করে তদন্তের জন্য প্রয়োজনীয়সংখ্যক কর্মকর্তা নিযুক্ত করতে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনকে (পিবিআই) নির্দেশ দেওয়া হয়।
জানা যায়, হাইকোর্টের নির্দেশে আরমান কারামুক্ত হলেও আপিল বিভাগের স্থগিতাদেশ থাকায় ক্ষতিপূরণের ২০ লাখ টাকা এখনও পাওয়া যায়নি। চার পুলিশ সদস্যকে চলতি দায়িত্ব থেকে প্রত্যাহার করা হয়নি। দায় নিরূপণে ৩ মাসের মধ্যে তদন্ত করে প্রতিবেদন দেওয়ার কথা থাকলেও তা দেওয়া হয়েছে ৫ মাস পর সোমবার।
আদালতে রিটের পক্ষে শুনানি করেন আইনজীবী হুমায়ন কবির পল্লব। জানতে চাইলে তিনি বলেন, রায়ে ২০ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ দেওয়ার নির্দেশনার বিরুদ্ধে চেম্বার জজ আদালতে আপিল করেন পুলিশের মহাপরিদর্শক। এছাড়া চার পুলিশ সদস্যকে চলতি দায়িত্ব থেকে প্রত্যাহারেরও আদেশের বিরুদ্ধেও আপিল করা হয়। আদালত এ দুটি আদেশে স্থগিতাদেশ দেন। আপিলটি বর্তমানে পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চে শুনানির অপেক্ষায় রয়েছে।
তিনি বলেন, ৩ মাসের মধ্যে তদন্ত করে আদালতে প্রতিবেদন জমা দেওয়ার কথা থাকলেও তা দেওয়া হয়েছে ১৪ জুন। এতে ৭ পুলিশ সদস্যের অবহেলা খুঁজে পেয়েছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। আইনজীবী বলেন, আদালতের নির্দেশনা ছিল তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার। কিন্তু পিবিআই ৭ পুলিশ সদস্যের অবহেলা চিহ্নিত করলেও তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেয়নি। এ বিষয়ে আদালত অবমাননার আবেদন করা হবে।
ক্ষতিপূরণের টাকা পায়নি জাহালম : আসামি না হয়েও ৩ বছর জেল খাটার ঘটনায় পাটকল শ্রমিক জাহালমকে ১৫ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ দিতে ব্র্যাক ব্যাংককে নির্দেশ দেন হাইকোর্ট। গত বছরের ৩০ সেপ্টেম্বর দেওয়া আদেশে বলা হয়, রায়ের কপি পাওয়ার ১ মাসের মধ্যে জাহালমকে ১৫ লাখ টাকা ব্র্যাক ব্যাংককে দিতে হবে। আর টাকা দেওয়ার এক সপ্তাহের মধ্যে সুপ্রিমকোর্টের রেজিস্ট্রার জেনারেলের দপ্তরে তা লিখিতভাবে জানাতে হবে।
জাহালমের আইনজীবী ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল অমিত দাস গুপ্ত বলেন, রায়ের পূর্ণাঙ্গ অনুলিপি প্রকাশ না হওয়ায় ক্ষতিপূরণের টাকা এখনও পাননি জাহালম। এছাড়া ব্র্যাক ব্যাংক রায়ের কার্যকারিতা স্থগিত চেয়ে চেম্বার জজ আদালতে আপিল (সিএমপি) ফাইল করেছে।
এক মানিকের পরিবর্তে অন্য মানিক কারাগারে : নামের আংশিক মিল থাকায় গত বছরের ২৮ নভেম্বর মানিক হাওলাদারকে গ্রেফতার করে পুলিশ। সেই থেকে তিনি সিরাজগঞ্জ জেলা কারাগারে আছেন। কারাগারে পাঠানোর বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে তার স্ত্রী সালমা বেগম ২ মার্চ রিটটি করেন। শুনানি শেষে মানিক মিয়ার বদলে মানিক হাওলাদারের কারাভোগের অভিযোগের বিচারিক তদন্তের নির্দেশ দেন হাইকোর্ট।
কুলসুমের বদলে মিনুর কারাভোগ : চট্টগ্রামে হত্যা মামলায় কুলসুম নামে এক নারীকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড, ৫০ হাজার টাকা জরিমানা, অনাদায়ে আরও ১ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দেন আদালত। কিন্তু কুলসুম সেজে আত্মসমর্পণ করে কারাগারে যান মিনু আক্তার। ৩১ মার্চ এ ঘটনা উচ্চ আদালতের নজরে আনেন আইনজীবী মোহাম্মদ শিশির মনির। শুনানি শেষে সাজাপ্রাপ্ত কুলসুম আক্তারে বদলে কারাগারে থাকা মিনু আক্তারকে সন্তুষ্টি সাপেক্ষে মুক্তির নির্দেশ দেন হাইকোর্ট। একই সঙ্গে প্রকৃত অপরাধী কুলসুম আক্তারকে গ্রেফতারে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে বলা হয়। এছাড়া নিরপরাধ মিনুর জেল খাটার ঘটনায় তিন আইনজীবী ও এক ক্লার্ককে ২৮ জুন তলব করেছেন হাইকোর্ট। হাইকোর্ট বেঞ্চ ৭ জুন এ আদেশ দেন। উচ্চ আদালতের নির্দেশে মিনু কারাগার থেকে মুক্তি পেয়েছেন কিনা বুধবার (১৬ জুন) আইনজীবী মোহাম্মদ শিশির মনিরের কাছে জানতে চাওয়া হয়। তিনি যুগান্তরকে বলেন, মিনু আজ (বুধবার) কারামুক্ত হয়েছেন।
নামের মিলের খেসারত : ডাকাতি মামলার আসামির সঙ্গে নামের মিল থাকায় খেসারত দিতে হলো কুমিল্লার লেপ-তোশকের দোকানি মো. ইউনুছকে (৫৫)। পুলিশের ভুলে বিনা দোষে ৫৮ দিন কারাভোগ করেন তিনি। ২০১৮ সালে আদালতের নির্দেশে মুক্তি পান তিনি।
এক নারীর সাজা খাটছেন আরেকজন : নিজের নামের একাংশ এবং স্বামীর নামের মিল থাকায় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনের এক মামলায় ২০১৯ সালে গ্রেফতার হয়।
সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত । এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা বা ছবি অনুমতি ছাড়া নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা সম্পূর্ণ বেআইনি।Design & Development : It Corner BD.Com 01711073884.
Leave a Reply