মাত্র ছয় দিন আগে নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে সজীব গ্রুপের হাশেম ফুড অ্যান্ড বেভারেজ লিমিটেডের কারখানায় যোগদান করেন কম্পা রানী বর্মণ। বৃহস্পতিবারের ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের পর তার খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না। তাই মেয়েকে খুঁজতে ঢাকা মেডিকেলের মর্গে ছুটে এসেছেন বাবা পরভা চন্দ্র বর্মণ।
ঘটনার দিন কারখানার দ্বিতীয় তলায় কাজ করছিলেন আরেক শ্রমিক চম্পা খাতুন। তার মা মিনা খাতুন কাজ করছিলেন চতুর্থ তলায়। অগ্নিকাণ্ডের আগে চম্পা নিচে নেমে এলেও মায়ের দেখা পাননি। তাই মায়ের খোঁজে ঢাকা মেডিকেলের মর্গে ছুটে এসেছেন তিনি।
অসুস্থ স্বামী কাজ করতে পারেন না এ কারণে সংসারের হাল ধরতে তিন মাস আগে কারখানাটিতে কাজ নেন ফিরোজা বেগম। অগ্নিকাণ্ডের পর তিনিও নিখোঁজ। তাই স্ত্রীর সন্ধানে ঢাকা মেডিকেলের মর্গে ছুটে আসেন স্বামী মো. জাহিদ।
পরভা চন্দ্র বর্মণ, চম্পা খাতুন এবং জাহিদের মতো অনেকেই স্বজনদের খোঁজে ছুটে এসেছেন ঢাকা মেডিকেলের মর্গে। অগ্নিকাণ্ডের পর কারও মেয়ে, কারও মা, কারও ভাগ্নে, কারও দূরসম্পর্কের আত্মীয় নিখোঁজ।
মেয়ে কম্পা রানীকে খুঁজতে আসা বাবা পরভা চন্দ্র বর্মণ জানান, তাদের গ্রামের বাড়ি সিলেটের হবিগঞ্জ। মেয়ে কয়েকদিন আগে নানির বাড়ি বেড়াতে নারায়ণগঞ্জ আসে। স্কুল বন্ধ তাই কিছু আয়ের আশায় ছয়দিন আগে কারখানাটিতে যোগ দেয়। কারখানায় অগ্নিকাণ্ডের পর মেয়েকে আর খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। মেয়ের কাজে যোগ দেওয়া এবং নিখোঁজ হওয়ার বর্ণনা দেওয়ার সময় কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি।
মায়ের খোঁজে ঢাকা মেডিকেলের মর্গে আশা চম্পা খাতুন কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, রাত ৮টায় কারখানার কাজ শেষে মায়ের সঙ্গে বাসায় যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু বিকলে আগুনের পর আর মাকে খুঁজে পাচ্ছি না। পরে শুনলাম ঢাকা মেডিকেলে অনেকের লাশ এসেছে। এখানে এসেও মায়ের দেখা পাইনি। আমার মা কোথায় আছে, কেমন আছে আল্লাহ ছাড়া কেউ জানে না। চম্পার গ্রামের বাড়ি কিশোরগঞ্জের সদরে। কারখানার পাশে তার বাবার একটি চায়ের দোকান আছে। তারা ছয় ভাইবোন। চার ভাই রূপগঞ্জের বিভিন্ন গার্মেন্টে কাজ করেন।
স্ত্রীর খোঁজে আসা মো. জাহিদ বলেন, আমি আগে গার্মেন্টে কাজ করতাম। শারীরিক অসুস্থতার কারণে ছয় মাস ধরে বেকার। তাই তিন মাস আগে ছয় হাজার টাকা বেতনে আমার স্ত্রী কারখানাটিতে চাকরি নেয়। ওভারটাইম দিয়ে মাসে আয় হতো ৯ হাজার টাকার মতো। স্ত্রীর সঙ্গে শেষ কথা হয় বৃহস্পতিবার সকালে। কারখানার চারতলায় স্ত্রী কাজ করতেন। বৃহস্পতিবার সকাল ৮টায় দিকে সে অফিসে যায়। এরপর আর ফিরে আসেনি।
জাহিদ বলেন, আমার স্ত্রী এখন কোথায় আছে, কী অবস্থায় আছে কিছুই জানি না। আমাদের একটাই মেয়ে। সে মায়ের জন্য কান্নাকাটি করছে।
বাবাহারা শান্তা মনি অভাবের সংসারের হাল ধরতে কাজ নেন সজীব গ্রুপের হাশেম ফুড অ্যান্ড বেভারেজ লিমিটেডের কারখানাটিতে। অগ্নিকাণ্ডের পর তিনিও নিখোঁজ। ঢাকা মেডিকেলের মর্গে শান্তা মনির খোঁজে আসা তার মামা বলেন, আমার ভাগ্নি কারখানার তৃতীয় তলায় কাজ করত। আগুন লাগার পর থেকে তার খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না।
ভয়াবহ আগুনের পুড়ে যাওয়া ৪৯টি মরদেহ ঢাকা মেডিকেলের মর্গে আনা হয়েছে। শরীর এমনভাবে পুড়েছে যে পরিচয় শনাক্তের জন্য ডিএনএ পরীক্ষা করতে হবে।
নারায়ণগঞ্জের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক শামীম বেপারী বলেন, ‘আমাদের পক্ষ থেকে স্বজনদের ডিএনএ নমুনা দেওয়ার জন্য ঢাকা মেডিকেলের মর্গে আসতে বলা হয়েছে। নারায়ণগঞ্জে ডিএনএ’র নমুনা রাখা বা মরদেহের পরিচয় শনাক্তে কোনো ব্যবস্থা নেই। তাই স্বজনদের ঢাকা মেডিকেলের মর্গে এসে ডিএনএ নমুনা দিতে হবে।’
প্রসঙ্গত, বৃহস্পতিবার বিকাল সাড়ে ৫টার দিকে রূপগঞ্জে হাশেম ফুড অ্যান্ড বেভারেজ লিমিটেডের কারখানায় আগুন লাগে। মুহূর্তেই আগুন ভবনের অন্যান্য তলায় ছড়িয়ে পড়ে। আতঙ্কে শ্রমিকরা ভবনের ছাদে জড়ো হন। ছাদসহ বিভিন্ন তলা থেকে লাফিয়ে পড়েন অনেকে। এতে ওই রাতেই তিনজনের মৃত্যুর খবর জানানো হয়, আহতও হন বেশ কয়েকজন। সর্বশেষ শুক্রবার সন্ধ্যা পর্যন্ত কারখানার পোড়া ধ্বংসস্তূপে থেকে ৪৯ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। এ নিয়ে মৃতের সংখ্যা বেড়ে ৫২ জন হয়েছে।
সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত । এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা বা ছবি অনুমতি ছাড়া নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা সম্পূর্ণ বেআইনি।Design & Development : It Corner BD.Com 01711073884.
Leave a Reply