
এম,আর, মন্টুঃ ” গত ২৫ বছরের জীবনে কুরবানী বাদ যায়নি এক বছরও।কিন্তু এ বছর কুরবানী দুরের কথা,স্ত্রী -সন্তানদের পেটে ভাত যোগাতে পত্রিকা বিলির পাশাপাশি ফুটপাতে পান সিগারেট বিক্রি করি।করোনা আমাকে পথে নামিয়ে দিল” ক্ষোভ প্রকাশ করে কথাগুলো বলছিল বরিশাল সদর সংবাদপত্র হকার্স ইউনিয়নের সহ-সভাপতি, মিডিয়া সংশ্লিষ্টদের কাছে পরিচিত মুখ শহিদুল ইসলাম ওরফে শহিদ। শুধু শহীদই নয়, বরিশাল নগরীতে কর্মরত প্রায় ১৫০ জন পত্রিকা হকাররা লকডাউনের কারনে বর্তমানে নিদারুণ কস্টে দিনযাপন করছেন।অনেকেই সংসার চালোনার তাগিদে ভিন্ন পেশা বেছে নিলেও অনভ্যস্ততার কারনে না পারছেন সেটা আকড়ে ধরে থাকতে,না পারছেন পুরান পেশা পত্রিকা বিক্রি ছেড়ে দিতে। এদিকে সরকার ঘোষিত বিভিন্ন ত্রান বিতরণ কার্যক্রম চললেও তাদের ভাগ্যে জুটেনি এক দানা চালও।এজেন্সি কর্তৃপক্ষের আর্থিক অবস্থা ভালো না থাকায় তারাও পারছেন না তাদের অধিনস্থ হকারদের দিকে সাহায্যের হাত বাড়াতে। বরিশাল সংবাদপত্র হকার্স ইউনিয়ন এবং বরিশাল সদর হকার্স ইউনিয়ন নামের দুটি সংগঠনের প্রায় দেড়শ হকার এই নগরী এবং তার আশেপাশের বিভিন্ন স্থানে পত্রিকা বিক্রি করে।প্রতিদিন কাক ডাকা ভোরে কেহ বাইসাইকেল কিংবা পায়ে হেটে বেরিয়ে পরে এজেন্সিগুলো থেকে সংগ্রহীত পত্রিকা অফিস, ব্যাবসা প্রতিষ্ঠান, বাসাবাড়ি সহ পত্রিকার পাঠকদের হাতে পৌঁছে দিতে। এ ক্ষেত্রে খরতাপ রৌদ্র কিংবা তুমুল ঝড় বৃষ্টি দমাতে পারেনা এই সকল মিডিয়া যোদ্ধাদের।তবে লকডাউনের কারনে পত্রিকা বিক্রির পরিমান অনেক কমে যাওয়ায় একরকম বেকার হয়েই দিন কাটছে নগরীতে কর্মরত পত্রিকা হকারদের।অপরদিকে পত্রিকা কর্তৃপক্ষ কিংবা সরকার থেকে কোন সাহায্য না পাওয়ায় জীবন ধারণ করাই কষ্টসাধ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। তার উপর শাখের করাতের মত মাথায় উপর কুরবানির উৎসব।সন্তানদের জন্য কিভাবে শুধু চিনি -সেমাই কিনবেন, সেই চিন্তায় চোখে শর্ষে ফুল দেখছেন পত্রিকার হকাররা।তাদের দাবী, যেখানে অন্য সাধারণ পেশার মানুষ বিভিন্ন কর্মসূচির মাধ্যমে সরকারি সাহায্য পাচ্ছে, সেখানে আমাদেরও ঈদের পুর্বেই যথাশীঘ্র সম্ভব সরকার প্রদত্ত সাহায্য প্রদান করা হোক।এ বিষয়ে জানতে চাইলে বরিশাল সংবাদপত্র হকার্স ইউনিয়ন এর সভাপতি মাইনুল ইসলাম মনির বলেন,করোনার কারনে আমরা খুবই কস্টে আছি।বর্তমানে একজন হকার প্রতিদিন ১০০ থেকে সর্বোচ্চ ২০০ টাকা আয় করে থাকে যা দিয়ে পরিবার নিয়ে কোন ভাবেই দিনযাপন করা সম্ভব না।এছাড়া আমরা নগদ টাকা দিয়ে এজেন্সি থেকে পত্রিকা কিনে বাকিতে বিক্রি করি।কিন্তু তা অনিয়মিত হওয়ায় ভয়ে গ্রাহকদের কাছে বিল চাইতেও পারি না। কারন গ্রাহক হয়ত রাগ করে পত্রিকা রাখা বন্ধ করে দিবে। এ প্রতিবেদকের সাথে আলাপকালে মনির আরও বলেন,আপনাদের মাধ্যমে সরকারের কাছে জানাই যে,আমাদের জন্য কিছু একটা করুন। সত্যিই আমরা খুব অসহায়।দীর্ঘ দিনের পেশা ছেড়ে দেওয়াও সম্ভব না।অভিন্ন বক্তব্য প্রকাশ করে কান্নাজড়িত কন্ঠে বরিশাল সদর সংবাদপত্র হকার্স ইউনিয়ন এর সভাপতি মাজহারুল ইসলাম বাদল বলেন, গত দেড় বছরে আমরা নিঃস্ব হওয়ার পাশাপাশি অনেক টাকা দেনা হয়ে গেছি।বর্তমানে নিত্যদিনের বাজার পর্যন্ত করতে পারি না।তার উপর আমার একটি মেয়ে খুবই অসুস্থ।এখন বাসা থেকে এক রকম পালিয়ে বেরাচ্ছি।তিনি আরও বলেন,দুবার আবেদন করেও সরকার থেকে ১ টি টাকাও সাহায্য পাইনি।অপরদিকে একই সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক হানিফ হাওলাদার ভোরের অঙ্গীকারকে বলেন, ভাই,আমরা সত্যিই খুব খারাপ অবস্থায় আছি যা ভাষায় প্রকাশ করতে পারি না। আমাদের নিয়ে আপনারা কিছু লিখুন যাতে করে সরকার আমাদের দিকে একটু দৃষ্টি দেয়।এদিকে এ বিষয়ে আলাপকালে নগরীর দক্ষিন পশ্চিমাংশে কাক ডাকা ভোর থেকে পত্রিকা নিয়ে দ্বারে দ্বারে হাজির হওয়া মিডিয়ার পরিচিত মুখ শংকর বলেন, করোনার কারনে পত্রিকা বিক্রি অর্ধেক কমে গেছে।এখন এ পেশায় টিকে থাকা দ্বায় হয়ে দাড়িয়েছে। বিকল্প কিছু খুজেও পাচ্ছি না, মানুষের কাছে হাতও পাততে পারি না।আরও একজন পরিচিত মুখ ইউনুস বলেন, আমার একটি ছেলে হাতেম আলী কলেজে এবং এক ছেলে জিলা স্কুলে পড়ে। কিন্তু আমাদের আয় ব্যাপক ভাবে কমে যাওয়ায় ছেলেদের পড়াশুনা বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে।বর্তমানে সুদের উপর টাকা এনে সংসার চালাচ্ছি।তবে পত্রিকার হকারদের সাথে একাত্নতা প্রকাশ করে আলম এজেন্সির স্বত্বাধিকারী মোঃ আলম শিকদার বলেন,করোনার কারনে পত্রিকা বিক্রি অনেক কমে গেছে।যা বিক্রি হয় তা দিয়ে একজন হকারের সংসার কোনভাবেই চালানো সম্ভব না।আবার দীর্ঘ দিন এই পেশায় জড়িত থাকার কারনে অন্য পেশায় চলে যাওয়াও সম্ভব না।সরকারের বিষয়টা ভাবা উচিত।
Leave a Reply