আকাশ থেকে শস্যখেতে কীটনাশক ছিটানোর কাজে ব্যবহারের জন্য ১৯৬৩ সালে বরিশালের বাবুগঞ্জ উপজেলার রহমতপুর ইউনিয়নে ‘প্ল্যান্ট প্রোটেকশন’ বন্দর হিসেবে দুই হাজার ফুট রানওয়ে নির্মাণ করা হয়।
স্বাধীনতার পর ১৯৮৫ সালে এটিকে বিমানবন্দর হিসেবে রূপান্তর করা হয়। এর ১০ বছর পর ১৯৯৫ সালের ১৭ জুলাই থেকে দিনের বেলা ঢাকা-বরিশাল রুটে বাণিজ্যিক বিমানের চলাচল শুরু হয়।
চলাচলের ২৭ বছরেও নানা জটিলতায় আধুনিক হয়নি বরিশাল বিমানবন্দর। পাশাপাশি আশানুরূপ বাড়েনি যাত্রী সেবার মান। বিমানবন্দর এলাকায় নদীভাঙন, ত্রুটিপূর্ণ বাউন্ডারি ওয়াল, গ্রেড অনুযায়ী রানওয়ে না থাকা ও নাজুক টার্মিনাল বিল্ডিং এবং রক্ষণাবেক্ষণ না হওয়ায় ঝুঁকি দেখা দিয়েছে। সব মিলিয়ে জোড়াতালি দিয়ে ঝুঁকির মধ্যেই বিমানবন্দর পরিচালনা করছেন কর্তৃপক্ষ।
জানা গেছে, গত ৯ ডিসেম্বর প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব আহম্মেদ কায়কাউস বরিশাল সফরকালে বিমানবন্দরের নানা অনিয়ম ও অসংগতি নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেন। এ সময় তিনি বিমানবন্দরের মান উন্নয়নে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য সংশ্লিষ্টদের নির্দেশনা প্রদান করেন। এরপরই নড়েচড়ে বসে সংশ্লিষ্টদপ্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারীগণ।
এমনকি জানুয়ারী মাসের প্রথম সপ্তাহে বিমানবন্দরে পরিদর্শন এসে নানা ঝুঁকি খুঁজে পান বাংলাদেশ বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) গঠিত পরিদর্শন কমিটির সদস্যরা।
পরিদর্শন শেষে ১৩ জানুয়ারী বিমানবন্দরের বিভিন্ন ঝুঁকি নিয়ে একটি প্রতিবেদন তৈরি করেন। ঝুঁকি সমাধানের প্রতিবেদনটি আবার বরিশাল বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হয়।
বেবিচক সূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশ বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) গঠিত পরিদর্শন কমিটির সদস্যরা ‘ইন্সপেকশন রিপোর্ট অব বরিশাল এয়ারপোর্ট’ শীর্ষক একটি প্রতিবেদন তৈরি করেন।
এছাড়াও প্রয়োজনীয় গামবুট ও হেলমেটও পাওয়া যায়নি। বিমাবন্দরের নিরাপত্তা দেয়াল ভেঙে গেছে। বিমানবন্দরের চারদিকের নিরাপত্তামূলক বাতিগুলো পড়ে আছে অকার্যকর অবস্থায় রয়েছে।
পর্যবেক্ষণ কমিটি সিভিল অ্যাভিয়েশন অনুমোদিত বিধি অনুযায়ী সেগুলো দ্রুত সম্ভব স্থাপনের সুপারিশ করেছে বেবিচক গঠিত পরিদর্শন কমিটি।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, বিমানবন্দর এলাকায় বিনাঅনুমতিতে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা থাকলেও বিধিনিষেধের তোয়াক্কা না করে আশপাশের এলাকার মানুষ বিমানবন্দরের ভেতরে অবাধে ঢুকে পড়ছেন।
কেউ কেউ বিমানবন্দরের রানওয়ের পাশের জমি থেকে ঘাস কেটে নিয়ে যাচ্ছেন, কেউ আবার গরু-ছাগল চরাচ্ছেন। এছাড়া বিমানবন্দরের দেয়াল মই দিয়ে টপকে এবং দেয়ালের নিচের ফাঁকা দিয়ে পশ্চিমাংশ এলাকার মানুষ পূর্ব পাশের বাজার ও দোকানপাটে যাতায়াত করছেন। তবে পাহারার ব্যবস্থা থাকলেও সংরক্ষিত বিমানবন্দর এলাকাটি তে মানুষের আনাগোনা রয়েছে।
একযাত্রী বলেন, তিনি প্রায়ই অফিসিয়াল কাজে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে যান। বিশেষ করে ঢাকায় জরুরী কাজ পড়লে বিমানেই যেতে হয়। কিন্তু বরিশাল বিমানবন্দরে নেই পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ও যাত্রী সেবা। এমনি কি ফ্লাইট বিলম্বিত হলেও বিমানবন্দর থেকে যাত্রীদের ঘোষণাও দেয়া হয়না।
গতমাসে বরিশাল থেকে ঢাকার উদ্দেশ্যে সকাল ১০ টায় ইউএস বাংলার ফ্লাইটে যাওয়ার কথা থাকলেও সেই ফ্লাইট ছেড়ে যায় বেলা দুইটার দিকে। এই মেসেজটিও দেয়া হয়নি। যাত্রীসেবা মান বাড়ানোর পাশাপাশি নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোড়দার এবং বিমানবন্দরের ভিতরের ক্যান্টিন আরো আধুনিক করা দরকার বলে মনে করছেন এই যাত্রী।
বরিশাল চেম্বার অব কমার্সের সভাপতি সাইদুর রহমান রিন্টু বলেন, বরিশাল বিভাগ তথা দক্ষিণাঞ্চলে ব্যাপক নানামূখী উন্নয়ন করছে বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকার। এখানে নির্মিত হয়েছে দেশের গভীরতম পায়রা সমুদ্রবন্দর। পাশাপাশি গড়ে উঠছে ছোট-মাঝারী ও বড় বড় শিল্পকল-কারখানা । আর দক্ষিণাঞ্চলে ব্যাপক উন্নয়নের ফলে এখানে প্রতিদিনই নতুন নতুন আসছেন।
এতে করে সবরুটে যাত্রী সাধারণের চাপ বাড়ছে। দ্রুত ব্যবসায়ী কাজ সম্পন্ন করার জন্য উদ্যোক্তা, সরকারী-বেসরকারী কর্মকর্তা, জনপ্রতিনিধিদের আকাশ পথে ঢাকার সাথে যোগাযোগ বাড়ছে। ফলে দিনের বেলার ন্যায় রাত্রিকালীন বিমান সার্ভিসের প্রয়োজনীয় দেখা দিয়েছে। কিন্তু বিমানবন্দরে আবহাওয়া স্টেশন না থাকায় দিনের বেলাতেই ঝুঁকি থাকছে।
সেক্ষেত্রে রাতে ঝুঁকি আরো বাড়ছে। তাই সকল ঝুঁকির উন্নয়ন করে বরিশাল বিমানবন্দর কে আরো আধুনিক করা উচিত। বাড়ানো উচিত যাত্রীসেবা। পাশাপাশি বিমানবন্দরের সার্বিক অবকাঠামো উন্নয়ন দরকার বলে মনে করছেন এই ব্যবসায়ী।
বেসরকারি বিমান সংস্থার বরিশাল স্টেশন ইনচার্জরা বলছেন, বরিশাল বিমানবন্দর এলাকায় নানা ঝুঁকির মধ্যে দিয়ে বিমান চলাচল করছে। অনেক সময়ই পাইলটরা নানামুখী সমস্যায় পড়েন। পাইলটরা সর্তক থাকায় দুর্ঘটনা ঘটছে না।
কিন্তু বিমানবন্দরের সকল ঝুঁকি এড়াতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা না নিলে যে কোন সময় বড় ধরণের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে বলে ধারণা করছেন তিনি। বরিশাল বিমানবন্দরের ব্যবস্থাপক আ. রহিম তালুকদার বলেন, বিভিন্ন কারণে বরিশাল বিমানবন্দরে কিছু ঝুঁকি আছে। সে ঝুঁকিগুলো খুঁজে সমাধানের চেস্টা চলছে।
এগুলো সমাধান শেষে বরিশাল বিমানবন্দর আধুনিক বিমানবন্দরে পরিনত হবে। ফলে বিমানবন্দরে যাত্রীসেবার মান এবং উড়োজাহাজের নিরাপত্তা বাড়বে। বরিশালের জেলা প্রশাসক জসীম উদ্দীন হায়দার বলেন, বরিশাল বিমানবন্দরটি নানা জটিলতায় ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে।
নানা ঝুঁকির কথা উল্লেখ করে বিষয়টি ইতিমধ্যেই সংশ্লিষ্ট দপ্তর কে জানানো হয়েছে। সে লক্ষ্যে ইতিমধ্যে সংশ্লিষ্ট দপ্তর থেকে প্রয়োজনীয় কার্যক্রম চলমান রয়েছে। বিমানমন্দর এলাকা নদীভাঙনের ঝুঁকির বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে প্রয়োজনী পদক্ষেপ নেওয়ার কার্যক্রম চলছে।
সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত । এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা বা ছবি অনুমতি ছাড়া নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা সম্পূর্ণ বেআইনি।Design & Development : It Corner BD.Com 01711073884.
Leave a Reply