অনলাইন ডেস্কঃ
খুন হয়েছেন একজন। তবে আদালতে দেওয়া তিন আসামির জবানবন্দিতে এসেছে অন্যজনের নাম। ঘটনার চার বছর পর জানা গেল, আসামিদের জবানবন্দিতে ‘খুন হওয়া’ ইমরান হোসেন ওরফে আজমল নামের ওই ব্যক্তি অন্য একটি মামলায় গ্রেফতার হয়ে কারাগারে বন্দি। আর খুন হওয়া ব্যক্তিটি হলেন মো. মুজিবুর।
কথিত ইমরান হত্যায় এই মুজিবুরকে অন্যতম সন্দেহভাজন খুনি হিসাবে চিহ্নিত করেছিল পুলিশ। এই হত্যায় ইমরান নিজেও অংশ নেয়। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে মুজিবুর হত্যার দায় স্বীকার করে ফৌজদারি দণ্ডবিধির ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন ইমরান।
অথচ চার বছর আগে তিন আসামির জবানবন্দিতে উঠে আসে, মাদক ব্যবসার বিরোধের জেরে তথাকথিত ইমরানকে গলা টিপে খুন করেন আসামিরা। কথিত এই হত্যার মিশনে খুন হওয়া মুজিবুরসহ ১০ জন অংশ নেন।
অর্থাৎ যে মুজিবুর খুন হয়েছেন, সেই মুজিবুরকেই অন্যতম হত্যাকারী হিসাবে চিহ্নিত করে পুলিশ। যদিও আদালতে সাজানো জবানবন্দি দেওয়া আসামিরা যুগান্তরের কাছে দাবি করেছেন, নির্মম নির্যাতন এবং ক্রসফায়ারের ভয়ে পুলিশের সাজানো গল্পে তারা আদালতে জবানবন্দি দিতে বাধ্য হয়েছেন।
ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) কদমতলী থানার একটি হত্যা মামলায় উল্লিখিত জবানবন্দির বিষয়ে যুগান্তরের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে এসব চাঞ্চল্যকর তথ্য। এমনকি মামলার তৎকালীন তদন্ত কর্মকর্তা এসআই প্রদীপ কুমার কুন্ড ‘সাজানো গল্পে’ হত্যার রহস্য উদ্ঘাটন করে পুরস্কৃতও হন। ২০১৭ সালের ১০ জুন ঢাকা ডিএমপির অপরাধ পর্যালোচনা সভায় তাকে পুরস্কৃত করা হয়। তদন্তের এই পর্যায়ে রহস্যঘেরা মুজিবুর হত্যায় কারাগারে বন্দি ইমরান এবং তার সহযোগীদের সন্দেহভাজন খুনি হিসাবে ধারণা করছেন বর্তমান তদন্ত সংশ্লিষ্টরা।
বাংলাদেশ সুপ্রিমকোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার জ্যোতির্ময় বড়ুয়া যুগান্তরকে বলেন, যারা হত্যায় জড়িত নন, তাদের কাছ থেকে স্বীকারোক্তি আদায় করা অন্যায়। প্রচণ্ড রকম শারীরিক নির্যাতন ছাড়া কেউ এ ধরনের স্বীকারোক্তি দিতে বাধ্য হবে না। মামলার রহস্য উদ্ঘাটনে দ্রুত কৃতিত্ব দেখাতে গিয়ে হোক বা যেভাবেই হোক, নির্যাতন করে স্বীকারোক্তি আদায় করেছে পুলিশ।
তিনজন কীসের ভিত্তিতে স্বীকারোক্তি দিয়েছিলেন, সেটি তদন্ত করে বের করা উচিত। আমি মনে করি, পুরো বিষয়টির আলাদা তদন্ত হওয়ার প্রয়োজন আছে। বিচার বিভাগীয় তদন্তও হতে পারে। এ ধরনের জবানবন্দি আদায়ের সঙ্গে যারা জড়িত ছিলেন প্রত্যেককে বিচারের আওতায় আনা উচিত।
অনুসন্ধানে জানা যায়, ২০১৭ সালের ২০ মে লাশ উদ্ধারের পর কদমতলী থানা পুলিশ কথিত ইমরান হত্যার গল্প সাজায়। তখন থানার ওসি ছিলেন কাজী ওয়াজেদ আলী। মামলার বাদী এসআই লিটন মিয়া। এজাহারে উল্লেখ করা তথ্যের সূত্র ধরেই মামলার তদন্ত ‘ভুল পথে’ পরিচালিত হয়।
বাদী এজাহারে তথ্য গোপন করার পাশাপাশি ‘অসমর্থিত’ সূত্রের বরাতে খুন হওয়া ব্যক্তি সম্পর্কে ‘ভুল ধারণা’ দেন। প্রকৃত খুন হওয়া মুজিবুরকে এজাহারেই সন্দেহভাজন খুনি হিসাবে উল্লেখ করেন তিনি। জামাল হোসেন ওরফে হিজড়া জামাল নামে এক ব্যক্তির ঘর থেকে লাশ উদ্ধার করা হলেও এ সম্পর্কে কোনো তথ্যই উল্লেখ করা হয়নি এজাহারে।
ঘটনার সময় তার অবস্থান কোথায় ছিল, এ বিষয়েও কোনো তথ্য নেই। তার দেওয়া বিভ্রান্তিকর তথ্য বিশ্বাস করে পুলিশ তিন আসামির জবানবন্দি আদায় করে। এ ঘটনার এক মাসের মধ্যে এসআই প্রদীপ কুমার নিশ্চিত হন ভুক্তভোগী প্রকৃতপক্ষে ইমরান নন। তিনি বেঁচে আছেন। এই তথ্য উদ্ঘাটনের পর তিনি বিষয়টি চেপে যান। জামাল পুলিশকে ভুল তথ্য দিয়েছেন, সেটি নিশ্চিত হলেও রহস্যজনক কারণে তাকে তখন আইনের আওতায় আনা হয়নি।
এদিকে ২০১৭ সালের ৩০ মে ঢাকা মহানগর পুলিশের নিউজপোর্টাল ‘ডিএমপিনিউজডটওআরজি’-তে মামলার রহস্য উদ্ঘাটন সংক্রান্ত একটি প্রতিবেদনে প্রকাশিত হয়। সেখানে উল্লেখ করা হয়, কথিত ইমরান হত্যার ঘটনায় বিল্লাল হোসেন এবং জালাল নামে দুজন স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়ে ঘটনার বিস্তারিত জানিয়েছে। কদমতলী থানা পুলিশ তদন্ত করে নিশ্চিত হয়েছে ওই লাশটি ইমরানের।
মামলার নথি পর্যালোচনা করে জানা যায়, ২০১৭ সালের ২০ মে কদমতলীর ঢাকা ম্যাচ এলাকার ইগলু আইসক্রিম ফ্যাক্টরির সামনে টিনের ছাপড়া ঘর থেকে অজ্ঞাতপরিচয় এক ব্যক্তির গলিত লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। লাশের শরীরে পচন ধরায় তাৎক্ষণিকভাবে পরিচয় শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি।
২২ মে অজ্ঞাত ব্যক্তিদের আসামি করে হত্যা মামলা করে পুলিশ। লাশ উদ্ধারের ১০ দিনের মধ্যেই ৫ জনকে গ্রেফতার করা হয়। তারা হলেন বিল্লাল হোসেন, জালাল, কালা সুমন, রাসেল ও মহিম। আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন বিল্লাল, জালাল ও সুমন। তারা তিনজনই এখন জামিনে আছেন।
আদালতে সাজানো জবানবন্দি দেওয়া বিল্লাল হোসেন এবং জালাল প্রায় একই ধরনের তথ্য দিয়ে যুগান্তরকে জানান, এসআই প্রদীপ কুমার কুন্ডর নেতৃত্বে তাদের গ্রেফতার করা হয়। তারপর নির্মম নির্যাতন চলে তাদের ওপর। মারধরের পাশাপাশি চোখে মরিচের গুঁড়া দেওয়া হয়। ক্রসফায়ারের ভয়ও দেখানো হয় তাদের। তারা পুলিশকে বারবার বলেছেন, তারা কোনো খুনের সঙ্গে জড়িত নন। কিন্তু পুলিশ কোনো কথাই শোনেনি।
বিল্লাল হোসেন বলেন, আমাকে গ্রেফতারের পর কদমতলীর ওয়াসার লেগুনার পাড়ে আনসার ক্যাম্পের সামনে নিয়ে নির্যাতন করা হয়। ইমরান হত্যার কথা স্বীকার না করলে ক্রসফায়ার দেওয়া হবে বলেও ভয় দেখানো হয়। পরে থানায় নিয়ে হাত-পা বেঁধে টেবিলে শুইয়ে লাঠি দিয়ে পিটিয়ে আমার ওপর নির্যাতন চলে। প্লাস দিয়ে চেপে ধরে শরীরের বিভিন্ন স্থানে ক্ষতবিক্ষত করা হয়।
নির্যাতনের পরও স্বীকার না করায় চোখে মরিচের গুঁড়া দেওয়া হয়। সহ্য করতে না পেরে জোরে চিৎকার দিলে মুখের মধ্যে গামছা ঢুকিয়ে দেয় এসআই প্রদীপ। তখ
সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত । এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা বা ছবি অনুমতি ছাড়া নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা সম্পূর্ণ বেআইনি।Design & Development : It Corner BD.Com 01711073884.
Leave a Reply