প্রিন্ট এর তারিখঃ এপ্রিল ২৩, ২০২৬, ১:৫৩ পি.এম || প্রকাশের তারিখঃ জুন ৩, ২০২১, ৫:১৭ পি.এম
৭৭ দিনের ‘নরকবাসের’ বর্ণনা দিলেন তরুণী।

অনলাইন ডেস্কঃ
টিকটকের ফাঁদে পড়ে ভারতে পাচার হওয়ার পর কৌশলে দেশে ফিরে আসা এক তরুণী ৭৭ দিনের ভয়ংকর অভিজ্ঞতার বর্ণনা দিয়েছেন পুলিশের কাছে। এই দিনগুলোকে তিনি নরকজীবনের সঙ্গে তুলনা করেছেন। এই অভিজ্ঞতা তিনি দুঃস্বপ্ন ভেবে ভুলে যেতে চান। মঙ্গলবার হাতিরঝিল থানায় পাচার চক্রের অন্যতম সদস্য রিফাদুল ইসলাম হৃদয় ওরফে টিকটক হৃদয় বাবুসহ ১২ জনকে আসামি করে মামলা করেন তিনি। ওইদিন রাতেই সাতক্ষীরার সীমান্তবর্তী দাবকপাড়ার কালিয়ানী এলাকা থেকে এজাহারনামীয় তিন আসামিকে গ্রেফতার করে পুলিশের তেজগাঁও বিভাগ।
পুলিশ জানায়, গ্রেফতার হওয়া মেহেদী হাসান বাবু, মহিউদ্দিন ও আব্দুল কাদের গত আট বছরে প্রায় দেড় হাজার নারী ভারতে পাচারে সরাসরি সহায়তা করেছেন। ৭৭ দিন পর ফিরে আসা কিশোরীও এই চক্রের মাধ্যমেই পাচারের শিকার হন। মহিউদ্দিন বাবুর কাছ থেকে মোবাইল ফোন এবং ডায়েরি উদ্ধার করেছে পুলিশ। ডায়েরিতে পাচার চক্রের অন্য সদস্যদের ভারতীয় নম্বর এবং পাচারকৃত নারীদের তথ্য রয়েছে। মামলার অন্য আসামিরা হলো- আনিস, হারুন, বকুল, সবুজ, রুবেল, সোনিয়া, আকিল ও ডালিম। পাচারের পুরো প্রক্রিয়া এবং খদ্দেরদের কাছে পাঠানো পর্যন্ত ১২ জনের বিষয়ে তথ্য দিয়েছেন ওই কিশোরী। এছাড়া চক্রের খপ্পরে পড়া থেকে শুরু করে ভারতে পাচার এবং সেখান থেকে পালিয়ে দেশে ফেরা পর্যন্ত পুরো ঘটনা যুগান্তরকে বলেছেন তরুণী। তিনি যে নির্মম নির্যাতনের বর্ণনা দিয়েছেন তা কল্পনাকেও হার মানায়। ঢাকা থেকে ব্যাঙ্গালুরুর যাত্রায় ভারত-বাংলাদেশ মিলে পাচার চক্রের পাঁচটি আস্তানায় (চক্রের ভাসায় সেফহোম) রাখা হয়। তাকে চক্রের সদস্যরা বিভিন্ন সময় ধর্ষণ করে। জোর করে মাদক সেবন করায়। একটি হোটেলে ১০ দিনের জন্য পাঠানো হয় তাকে। সেখানে একদিনে ১৯ জন তাকে ধর্ষণ করে। এক পর্যায়ে তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন। এভাবে প্রতিদিন তার ওপর অমানুষিক নির্যাতন করা হয়। এই তরুণীর সঙ্গে আরও দুজন কৌশলে ভারত থেকে ফিরে এসেছেন। পুলিশ অন্য দুই তরুণীকে খুঁজে বের করার চেষ্টা করছে।
পুলিশের তেজগাঁও বিভাগের ডিসি শহিদুল্লাহ যুগান্তরকে বলেন, কৌশলে পালিয়ে আসা ভুক্তভোগীকে নেশাজাতীয় দ্রব্য খাওয়ানো হয়। জোর করে বিবস্ত্র করে ভিডিও ধারণ করা হয়। ভিডিও পরিবারের সদস্য কিংবা পরিচিতদের কাছে পাঠিয়ে দেওয়ার হুমকি দিয়ে জিম্মি করে রাখা হয়েছিল তাকে। ব্যাঙ্গালুরুতে পৌঁছানোর কয়েকদিন পরই চেন্নাইয়ের একটি হোটেলে ১০ দিনের জন্য পাঠানো হয় তাকে। সেখানে অমানবিক শারীরিক ও বিকৃত যৌন নির্যাতন করা হয় তাকে। চক্রের সদস্যদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনার চেষ্টা চলছে।
পুলিশের তেজগাঁও বিভাগের এডিসি হাফিজ আল ফারুক বলেন, প্রলোভনের ফাঁদে ফেলে কৌশলে এই তরুণীকে ভারতে পাচার করে টিকটক হৃদয় বাবু। সেখানে অবস্থান করার সময় তিনি আরও অনেক বাংলাদেশি তরুণীকে দেখেছেন, যারা বিভিন্ন সময়ে এই চক্রের মাধ্যমে পাচার হয়েছেন। তরুণী হাতিরঝিল থানায় মানবপাচার প্রতিরোধ আইনে মামলা করেছেন। তদন্তে যাদের সংশ্লিষ্টতা পাওয়া যাবে তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
পুলিশ জানায়, মেহেদী হাসান বাবু মামলার বাদী তরুণীসহ দেড় হাজার নারী পাচারে জড়িত ছিল বলে স্বীকার করেছে। সাত থেকে আট বছর ধরে পাচারে জড়িত মেহেদী হাসান বাবুর মোবাইল ফোন ও ডায়েরিতে টিকটক হৃদয়, সাগর, সবুজ, ডালিম ও রুবেলের ভারতীয় মোবাইল নম্বর পাওয়া গেছে। তার ডায়েরিতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল ভিডিওর ভিকটিমের আধারকার্ড নম্বর ও ভারতে পাচারকৃত উল্লেখযোগ্যসংখ্যক ভিকটিমের নাম ও মানবপাচারে জড়িত ব্যক্তিদের বিস্তারিত তথ্য পাওয়া গেছে। মহিউদ্দিন ও আব্দুল কাদের সীমান্তবর্তী এলাকায় পাচারের কাজে ব্যবহারের জন্য নির্মিত কক্ষে ভিকটিমদের অবস্থানে সহায়তার পাশাপাশি তাদের মোটরসাইকেলযোগে সীমান্তের শেষপ্রান্তে ভারতীয় দালালের হাতে তুলে দেওয়ার কথা স্বীকার করেছে।
যেভাবে পাচার করা হয় তরুণীকে : ভুক্তভোগী তরুণী জানান, ২০১৯ সালে হাতিরঝিলে মধুবাগ ব্রিজে টিকটক হৃদয় বাবুর সঙ্গে তার পরিচয় হয়। তিনি মালিবাগের একটি শপিংমলে সেলসম্যানের চাকরি করতেন। সেখানে টিকটক হৃদয় বাবু তার সঙ্গে বিভিন্ন সময় দেখা করেছে।
একাধিকবার প্রেমের প্রস্তাব দিয়েছে। কখনো টিকটক স্টার বানানো, কখনো ভালো বেতনের চাকরির প্রলোভন দেখায়। ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারিতে নারায়ণগঞ্জের অ্যাডভেঞ্চার ল্যান্ড পার্কে ৭০ থেকে ৮০ জনকে নিয়ে টিকটক পার্টি করে হৃদয়। একই বছরের ১৮ সেপ্টেম্বর গাজীপুরের আফরিন গার্ডেন রিসোর্টে ৭০০ থেকে ৮০০ জন তরুণ-তরুণীকে নিয়ে পুল পর্টির আয়োজন করে। ২০২১ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারি কুষ্টিয়ার লালন শাহ মাজারে টিকটিক হ্যাংআউটে নিয়ে যাওয়ার কথা বলে হৃদয় বাবু একটি বাসে করে তাকে সাতক্ষীরা সীমান্তে নিয়ে যায়। সেখানে প্রথমে আলম নামে এক ব্যক্তির বাসায় রাখে। এরপর ৬ জন মেয়েসহ তাদের সীমান্তের ওপারে পাঠানো হয়। সেখান থেকে মোটরসাইকেলে করে তাদের বকুল ওরফে ছোট খোকন নামে এক ব্যক্তির বাসায় রাখা হয়। তখনই তিনি বুঝতে পারেন তাকে পাচার করা হচ্ছে। তিনি কান্না করতে থাকলে একদিন পরই তাকে অন্য একটি বাসায় স্থানান্তর করা হয়। সেখানে তার সঙ্গে আরও এক কিশোরী ছিল। তারা দুজন বিষয়টি স্থানীয়দের জানাতে চাইলে, হৃদয় বাবুসহ অন্যরা বলে, ‘অবৈধভাবে ভারতে এসেছো তোমরা। জানতে পারলে ২০ বছর জেল হবে।’ আধারকার্ড বানানোর জন্য বকুল নামের এক ব্যক্তি এসে তার ছবি তুলে নিয়ে যায়। ওইদিন রাতেই টিকটক বাবুসহ দুজন জোরপূর্বক তার সঙ্গে শারীরিক সম্পর্ক স্থাপন করে। তারপর দুই তরুণীর আধারকার্ড বানিয়ে একটি ফ্লাইটে তাদের ব্যাঙ্গালুরুতে পাঠিয়ে দেওয়া হয়।
ব্যাঙ্গালুরুর অভিজ্ঞতা সম্পর্কে তরুণী বলেন, বিমানযোগে ব্যাঙ্গালুরুতে পৌঁছার পর সবুজ ও রাহুল ওরফে রুবেল নামে দুজন তাদের গ্রহণ করে। তারপর আনন্দপুরা সার্কেলে রুবেল
প্রকাশক ও সম্পাদক : ফয়সাল হাওলাদার।
Copyright © 2026 মেহেন্দিগঞ্জ টাইমস ।। Mehendiganj Times. All rights reserved.