প্রিন্ট এর তারিখঃ এপ্রিল ২৩, ২০২৬, ৩:০০ এ.এম || প্রকাশের তারিখঃ মে ১, ২০২১, ৮:৪৩ এ.এম
করোনায় শ্রমিকের অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ

অনলাইন ডেস্কঃ
স্বাভাবিক সময়েই দেশে বড় সমস্যা ছিল কর্মসংস্থানের। এরপর দুই দফা করোনার আঘাতে বিপর্যস্ত দেশের শ্রমবাজার। বর্তমানে শ্রমিকদের চরম দুর্দিন চলছে। অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে আয়বৈষম্য। চরম অনিশ্চয়তায় তাদের জীবনযাত্রা। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর তথ্যানুসারে দেশের শ্রমিকরা দু-ধরনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করছেন। প্রথমত অর্থনীতি আর দ্বিতীয়ত স্বাস্থ্য।
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট লেবার স্টাডিজের (বিলস) তথ্যানুসারে শহর এলাকার ৬৯ শতাংশ চাকরিজীবী কাজ হারানোর উচ্চ ঝুঁকিতে। দেশের মোট অর্থনীতিতে এদের অবদান ৪৯ শতাংশ। ৫০ শতাংশ শিল্পপ্রতিষ্ঠান তাদের ৭৬ থেকে শতভাগ শ্রমিককে লে-অফ দিয়েছে। সামগ্রিকভাবে ৩৭ শতাংশ শ্রমিকের আয় কমেছে। আর বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টার (পিপিআরসি) ও ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গভর্ন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (বিআইজিডি) এক যৌথ সমীক্ষায় বলা হয়েছে, করোনার কারণে নতুন করে দরিদ্র হয়েছে আড়াই কোটি মানুষ।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) তথ্যানুসারে করোনায় এক কোটি ৬৪ লাখ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে চলে এসেছে। এদের অধিকাংশ শ্রমজীবী। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও) বলছে, করোনায় বিশ্বব্যাপী শ্রমিকরা বড় ধরনের অর্থনৈতিক সমস্যায় পড়েছেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর এমন সমস্যা আর দেখা যায়নি। অর্থাৎ, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সব কটি সংস্থাই বলছে, করোনায় সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত শ্রমিকরা। দ্রুত এখান থেকে উত্তরণের পথও নেই।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, এই সমস্যা সমাধানে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। করোনা-উত্তর দেশে বিনিয়োগে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে, না-হলে জনশক্তি বোঝা হয়ে দাঁড়াবে। জানতে চাইলে সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অর্থ উপদেষ্টা ড. এবি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম যুগান্তরকে বলেন, অর্থনীতির যে হিসাব ছিল, করোনা সবকিছুই পালটে দিয়েছে। এটি শ্রমিকদের জন্য বিশাল চ্যালেঞ্জ নিয়ে এসেছে। তিনি বলেন, দেশের অর্থনীতির মূল শক্তি হলো বেশিরভাগ মানুষ কর্মক্ষম। এদের মজুরিও প্রতিযোগী দেশের তুলনায় কম। তবে সামগ্রিকভাবে বিচার করলে শ্রমিকদের দক্ষতার অভাব রয়েছে। জনশক্তি এখনো সম্পদে পরিণত হয়নি। ফলে শ্রমিকদের যে সম্ভাবনা রয়েছে, তা কাজে লাগানো যায়নি। তিনি বলেন, বিশাল বিনিয়োগের মাধ্যমে দেশে কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে হবে। না-হলে জনশক্তি বোঝা হয়ে দাঁড়াবে। আর সিপিডি বলছে, মানুষের কর্মসংস্থানের জন্য এবারের বাজেটে সম্প্রসারণমূলক সামষ্টিক অর্থনীতিতে যেতে হবে। এক্ষেত্রে শ্রমঘন শিল্পখাতে জোর দিতে হবে।
শ্রম আইন ২০০৬ সালের ২(৬৫) ধারায় বলা হয়েছে, শ্রমিক হলো ওই ব্যক্তি, যিনি তার চাকরির শর্ত পালন করে কোনো প্রতিষ্ঠানে বা শিল্পে সরাসরি বা কোনো ঠিকাদারের মাধ্যমে মজুরি বা অর্থের বিনিময়ে দক্ষ, অদক্ষ, কায়িক, কারিগরি, ব্যবসা উন্নয়নমূলক অথবা কেরানিগিরির কাজে নিযুক্ত।
করোনায় বাংলাদেশের শ্রমিকদের ক্ষতি নিয়ে সম্প্রতি একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে সিপিডি ও বিলস। প্রতিবেদনে বিশ্বব্যাংক, আইএলও, বিবিএস এবং বিআইডিএসের তথ্য ব্যবহার করা হয়। প্রতিবেদনে শ্রমিকদের তিন স্তরের ঝুঁকির কথা বলা হয়েছে। এর মধ্যে সুনির্দিষ্ট ৭টি খাতের শ্রমিক কাজ হারানোর উচ্চ ঝুঁকিতে রয়েছেন। খাতগুলো হলো : শিল্পপ্রতিষ্ঠানের শ্রমিক, নির্মাণ, পরিবহণ, বিক্রয়কর্মী, খাদ্য এবং ব্যক্তিগত সেবাকর্মীরা। এক্ষেত্রে শহরাঞ্চলের মোট শ্রমশক্তির ৬৯ শতাংশই উচ্চ ঝুঁকিতে। দেশের মোট অর্থনীতিতে এদের অবদান ৪৯ শতাংশ। ৫০ শতাংশ প্রতিষ্ঠান তাদের ৭৬ থেকে শতভাগ শ্রমিককে ‘লে-অফ’ দিয়েছে। মধ্যমানের ঝুঁকিতে আর্থিক খাত, গৃহকর্মী, আবাসন ও শিক্ষাখাতের শ্রমিক। আর তুলনামূলক কম ঝুঁকিতে কৃষি, স্বাস্থ্য, তথ্য ও যোগাযোগখাতের শ্রমিকরা।
প্রতিবেদনে বলা হয়, অপ্রাতিষ্ঠানিক শ্রমিকরা বেশি সমস্যায়। কারণ, সহায়তা পৌঁছানোর জন্য, তাদের তালিকাও সরকারের কাছে নেই। শহরে অপ্রাতিষ্ঠানিখাতে ১০ লাখ ৮০ হাজার লোক কাজ হারিয়েছে। বেতনভুক্ত ৪৯ শতাংশ শ্রমিকের আয় কমেছে। সার্বিকভাবে ৩৭ শতাংশ শ্রমিকের মজুরি কমেছে। এর মধ্যে ৪২ শতাংশ ঢাকায়। ৩৩ শতাংশ চট্টগ্রামে। সরকারি প্রতিষ্ঠান বিআইডিএসের রিপোর্ট অনুসারে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের ৬৬ শতাংশ শ্রমিকের আয় কমেছে। এ ছাড়াও বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর রিপোর্ট অনুসারে ২০২০ সালে ২০ শতাংশ পরিবারের আয় কমেছে। সিপিডির তথ্যানুসারে ২০১৭ সালে দেশে দারিদ্র্যের হার ছিল মোট জনসংখ্যার ২০ শতাংশ। ২০২০ সাল শেষে তা বেড়ে ৩৩ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। অর্থাৎ, করোনায় নতুন করে ১৩ শতাংশ মানুষ দরিদ্র হয়েছে। সংখ্যার হিসাবে যা এক কোটি ৬৪ লাখ। এর মধ্যে ৬৩ শতাংশ তাদের বাড়িভাড়া দিতে পারছে না। ৩৯ শতাংশ ইউটিলিটি বিল দিতে অক্ষম। স্কুলের ফি দিতে পারেনি ৩৬ শতাংশ এবং ৫৭ শতাংশ শ্রমিক গ্রামে পরিবারকে টাকা পাঠাতে পারেননি। শ্রমিকদের নিয়ে কাজ করা সংগঠন বিলসের তথ্যানুসারে শহরের বস্তিতে থাকা ৪৭ শতাংশ এবং মোট শ্রমিকের ৩২ শতাংশ তাদের খাবারের পরিমাণ কমিয়েছেন। এ ছাড়াও শহরের বস্তিবাসীর ৬৭ শতাংশ এবং গ্রামের ৩২ শতাংশ মানুষ তাদের চাহিদা মেটাতে সঞ্চয় ভেঙে খেয়েছেন। এ ছাড়াও ৫৯ শতাংশ নারী উদ্যোক্তা খরচ মেটাতে তাদের সঞ্চয় ভেঙেছেন। প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়, করোনা মোকাবিলায় এ পর্যন্ত এক লাখ ২৬ হাজার ৮৫৩ কোটি টাকার প্যাকেজ ঘোষণা করা হয়। এর মধ্যে শ্রমিক, এসএমই উদ্যোক্তা, নিম্ন আয়ের কৃষক, ছোট ব্যবসায়ী, প্রান্তিক জনগোষ্ঠী, বেকার এবং দরিদ্র শ্রমিকদের জন্য বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে মাত্র ৪৪ হাজার ৯৭৩ কোটি টাকা, যা মোট বরাদ্দের ৩৫ দশমিক ৪ শতাংশ। আবার এই খাতগুলোর জন্য বরাদ্দের মধ্যে গত বছরের অক্টোবর পর্যন্ত বিতরণ হয়েছে ২৫ হাজার ৪৫৭ কোটি টাকা, যা মোট বরাদ্দের ৫৬ শতাংশ। দরিদ্রদের মধ্যে শহরে নগদ সহায়তা পেয়েছেন ২৫ শতাংশ এবং গ্রামে তা ১৮ শতাংশ।
প্রকাশক ও সম্পাদক : ফয়সাল হাওলাদার।
Copyright © 2026 মেহেন্দিগঞ্জ টাইমস ।। Mehendiganj Times. All rights reserved.