ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে ফ্লাইট অপারেশন পাইলটদের বেতন কর্তন নিয়ে অসন্তোষ বিমানে
-
আপডেট সময় :
রবিবার, ২৫ এপ্রিল, ২০২১
-
২৭২
০ বার সংবাদটি পড়া হয়েছে

দীর্ঘদিন ধরে পাইলটদের বেতন কর্তন নিয়ে চরম অসন্তোষ চলছে বিমানে। অভিযোগ রয়েছে, বিমান পাইলটদের বেতন ২৫-৫০ শতাংশ হারে কর্তনের সিদ্ধান্ত হলেও ভুল হিসাবের কারণে এক বছর ধরে ২০ শতাংশ হারে অতিরিক্ত কর্তন করা হচ্ছে। এ অবস্থায় একজন সিনিয়র পাইলটের বেতন কমে হয়েছে ৩ লাখ ৪৮ হাজার টাকা।
মহামারির আগে পেতেন ট্যাক্স বাদ দিয়ে ৮ লাখ ৬১ হাজার টাকা। অপরদিকে যাদের চাকরির বয়স ৫ বছরের মধ্যে তাদের বেতন কমে হয়েছে ১ লাখ ৭৩ হাজার টাকা। আগে একজন কো-পাইলট (ফার্স্ট অফিসার) পেতেন ৩ লাখ ৮২ হাজার টাকা এখন পাচ্ছেন ১ লাখ ৭৩ হাজার টাকা। পাইলটরা বলেছেন, বিমান ম্যানেজমেন্টের ভুল হিসাবের কারণে এ বিভ্রাট। এ নিয়ে পাইলটদের মধ্যে অসন্তোষ চলছে। তারা বলেছেন, আমরা হতাশ। মানসিকভাবে অসুস্থ।
এ ধরনের যন্ত্রণা নিয়ে বিমান পরিচালনা চরম ঝুঁকিপূর্ণ। করোনায় বেতন কমবে এটা স্বাভাবিক। কিন্তু ভুল তথ্য দিয়ে বেতন কমানো চরম বিশ্বাসঘাতকতা। একে তো তাদের বেতন কমানো হয়েছে উল্টা মন্ত্রণালয়কে জানানো হয়েছে সিনিয়র পাইলটরা বেতন পাচ্ছেন ৬ লাখ আর জুনিয়ররা সাড়ে ৩ লাখ টাকা। তারা বলেছেন, শতাংশের হিসাবে তাদের কাছ থেকে ৭০ ভাগের বেশি বেতন কর্তন করা হচ্ছে। পাইলটদের অভিযোগ, করোনার কারণে যখন বিশ্বব্যাপী দুঃসময় যাচ্ছিল তখন পাইলটরা ঝুঁকি নিয়ে ফ্লাইট পরিচালনা করেছেন। এক বছরে ২৫ জন পাইলট করোনা আক্রান্ত হয়েছেন। এখনও ৭ জন করোনা পজিটিভ নিয়ে হাসপাতালে রয়েছেন। ৮ জন পাইলটের পুরো পরিবার করোনায় আক্রান্ত। ফ্লাইট করে এসে কোয়ারেন্টিনের সুযোগও ছিল না। ফ্লাইট নিয়ে বিদেশে গিয়ে নিজের টাকায় করোনা টেস্ট করতে হয়েছে। অথচ মিথ্যা তথ্যে তাদের বেতন কর্তন করা হচ্ছে।
অভিযোগ রয়েছে, বিমানের সাবেক পরিচালক ফাইন্যান্স বিনীত সুদের নেতৃত্বে তৈরি হিসাবের কারণে এক বছর ধরে ৭০ শতাংশ হারে পাইলটদের বেতন কর্তন করা হচ্ছে। পাইলটদের সংগঠন বাংলাদেশ পাইলট অ্যাসোসিয়েশন (বাপা) থেকে একাধিকবার বিমানের শীর্ষ ম্যানেজমেন্টের সঙ্গে আলোচনা করতে চাইলেও ম্যানেজমেন্ট রাজি হয়নি। অথচ এ দুর্যোগে বিমানের অনেক শীর্ষ কর্মকর্তার ১ টাকাও বেতন কর্তন করা হয়নি। এ ব্যাপারে খোদ মন্ত্রণালয় পর্যন্ত নির্বাক ছিল।
একজন সিনিয়র পাইলট যুগান্তরকে বলেন, ঢাকা-লন্ডন-ঢাকা সরাসরি ফ্লাইট করতে কমপক্ষে ৬ জন পাইলট লাগে। সেখানে ৩ জনকে দিয়ে ফ্লাইট চালানো হয়েছে। বিশ্রাম ছাড়া টানা ৩৬ ঘণ্টা পর্যন্ত ফ্লাই করেছেন। পাইলটরা এ ক্ষেত্রে ‘ফেটিক রিপোর্ট ফরম’ বা ক্লান্তিজনিত ফরম দাখিল করলেও তা ছুড়ে ফেলে দেয়া হয়েছে। করোনায় পাইলট ও তাদের পরিবারের সদস্যরা কোথায় চিকিৎসা পাবে সে ব্যাপারে ন্যূনতম সহযোগিতাও করেনি বিমান। উল্টো চিকিৎসা ভাতা বন্ধ করে দিয়েছে। জানা গেছে, বিমান ২০২০ সালের এপ্রিলে সর্বন্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারীর মূল বেতনের ১০ শতাংশ কর্তনের সিদ্ধান্ত নেয়। যেহেতু বিমান ও বাপার মধ্যে দ্বিপক্ষীয় চুক্তি রয়েছে তাই বাপার সঙ্গে আলোচনা হয়, তাতে বিমানের পাইলটরা ১২ শতাংশ আর কো পাইলটদের ১০ শতাংশ হারে বেতন কর্তনে দুই পক্ষ সম্মত হয়। কিন্তু মে মাস থেকে বিমান পরিচালনা পর্যদ আলোচনা ছাড়াই পাইলটদের চাকরির বয়সভেদে ২৫-৫০ শতাংশ কর্তনের সিদ্ধান্ত নেয়। বাস্তবে কর্তনের হার ছিল ৫০-৭০ শতাংশ।
বাপা সভাপতি ক্যাপ্টেন মাহবুবুর রহমান যুগান্তরকে বলেন, ২০০৮ সাল থেকে বিমান পাইলটদের পূর্বের বেতন কাঠামো থেকে আউটার স্টেশন এলাউন্সসহ ৯টি ভাতা বাদ দিয়ে প্যাকেজ বেতন দিয়ে আসছে। বিমান ট্যাক্স রেয়াত পাওয়ার সুবিধায় বেতনের আরেকটি অংশ ওভারসিস এলাউন্স নামে বিদেশ থেকে ডলারের মাধ্যমে পরিশোধ করা হতো। কিন্তু একজন বাংলাদেশি বেতনের অংশ হিসাবে ডলার পেতে পারেন না এমন আইনি জটিলতার কারণে ২০১৭ সাল থেকে এ এলাউন্স বেতনের অংশ হিসাবে বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রদান করা শুরু করে। বেতন কাঠামো অনুয়ায়ী এই এলাউন্স পাইলটদের বেতনেরই অংশ। এটি বিদেশ যাওয়া বা ফ্লাইটের সঙ্গে সম্পর্কিত কিছু নয়। অথচ বিমান ম্যানেজমেন্ট আলোচনা ছাড়াই প্রশাসনিক আদেশ দিয়ে মূল বেতন থেকে প্রথমে ওভারসিস এলাউন্স ২ লাখ ১৬ হাজার টাকা কর্তন করে। পরে বয়স অনুযায়ী মোট বেতন থেকে ২৫ থেকে ৫০ শতাংশ হারে কর্তন করা হয়।
বাপা সূত্র জানায়, বিমানের সিনিয়র পাইলটের বেতন বেসিক ২ লাখ ৫৯ হাজার টাকা। হাউজ রেন্ট ১ লাখ ৫৫ হাজার টাকা, কমার্শিয়াল এলাউন্স ১ লাখ ৮২ হাজার টাকা, ওভারসিস এলাউন্স ২ লাখ ১৬ হাজার টাকা, কিট, টেল ও ইন্টারন্যাশনাল এলাউন্স ২০ হাজার টাকা এবং ¯েপশাল এলাউন্স ৩ লাখ ৬৮ হাজার টাকা। সব মিলিয়ে প্যাকেজ আকারে মোট ১২ লাখ ১ হাজার টাকা হতো। আগে এ টাকা থেকে ট্যাক্স বাদে সিনিয়র পাইলটের বেতন ছিল ৮ লাখ ৬১ হাজার টাকা। পাইলট অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ক্যাপ্টেন মাহবুব বলেন, বিমানের প্রশাসনিক আদেশ অনুযায়ী যদি সিনিয়র পাইলটের বেতন ৫০ শতাংশ কর্তন করা হয় তাহলে তার বেতন হওয়ার কথা ৪ লাখ ৩০ হাজার টাকা। কিন্তু বাস্তবে দেয়া হচ্ছে ৩ লাখ ৪৮ হাজার টাকা।
অর্থাৎ বেতন থেকে প্রথমে ওভারসিস এলাউন্স ২ লাখ ১৬ হাজার টাকা কেটে ফেলা হয়েছে। তারপর ওই বেতন থেকে ৫০ শতাংশ কর্তন করা হয়েছে। এখানে মাসে ৮২ হাজার টাকা কোথায় যাচ্ছে কেউ জানে না। বিমানের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা যুগান্তরকে বলেন, পাইলটদের বেতন কর্তনের বিষয়টি বিমান ম্যানেজমেন্টের নজরে এসেছে। যার কারণে আগে যেভাবে কর্তন করা হতো তার চেয়ে এখন ১০ শতাংশ হারে কম কর্তন করা হচ্ছে। আশা করছি ফ্লাইট পরিচালনা শুরু হলে সবকিছু ঠিক হয়ে যাবে।
Like this:
Like Loading...
নিউজটি আপনার বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুন
এই ক্যাটাগরির আরো সংবাদ
Leave a Reply