প্রিন্ট এর তারিখঃ মার্চ ১১, ২০২৬, ৭:০৬ এ.এম || প্রকাশের তারিখঃ মার্চ ৬, ২০২১, ১১:৪২ এ.এম
সারা দেশেই মশার যন্ত্রণায় অতিষ্ঠ মানুষ
![]()
অনলাইন ডেস্ক:
মশার আক্রমণে বিপর্যয়ে ঢাকাবাসী। শুধু রাজধানী নয়, সারা দেশেই মশার যন্ত্রণায় অতিষ্ঠ মানুষ। গ্রামে-গঞ্জে, শহরে-বন্দরে সবার মুখেই এখন যন্ত্রণার নাম মশা। রাত নেই দিন নেই ২৪ ঘণ্টাই মশার উৎপাত। মশার যন্ত্রণায় অনেকেরই কাটছে নির্ঘুম রাত। বছরে বছরে মশা মারতে বাড়ছে বাজেট, দফায় দফায় পাল্টানো হচ্ছে ওষুধ। টেন্ডারও হচ্ছে ওষুধ আমদানিতে। কিন্তু বাস্তবে মরছে না মশা। ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন মাঝেমধ্যেই গণমাধ্যমের উপস্থিতিতে মশা মারতে মহড়া দেয়। কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হয় না। মশা মারতে নেই প্রযুক্তিনির্ভর কোনো কার্যক্রম। নগর বিশ্লেষকরা বলছেন, মশা বৃদ্ধির মূল উৎস বদ্ধ জলাধার ও ড্রেন। আবার ডেঙ্গু মশার উৎস ভিন্ন। বাসাবাড়িতে নির্মাণাধীন উন্মুক্ত আধার ও পরিষ্কার পানি। মশা নিধনে জরুরি এখন দুই সিটি করপোরেশনসহ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর সমন্বিত উদ্যোগ। প্রকল্পের নামে কোটি কোটি টাকা অপচয় না করে বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ নিয়ে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। প্রয়োজনে টাস্কফোর্স গঠন করে চালাতে হবে নিয়মিত অভিযান। একই সঙ্গে ব্যক্তি-প্রতিষ্ঠান সবাইকে হতে হবে সচেতন।
শীতের মৌসুমের শুরু থেকেই মশার অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে ওঠে নগরজীবন। চার-পাঁচ মাস ধরে এ অবস্থা চললেও কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নিতে পারেনি ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন। লোক দেখানো অভিযান, কমিটি আর মিডিয়া কাভারেজ নিয়ে ব্যস্ত সংস্থা দুটি। প্রায়ই গণমাধ্যমগুলোয় বিজ্ঞপ্তি পাঠিয়ে কাভারেজের অনুরোধ জানানো হয় দুই সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে। গণমাধ্যমকর্মীরা উপস্থিত হন। কিন্তু তারা চলে গেলেই সরে যান সিটি করপোরেশনের মশক নিধন কর্মীরাও। ফলে এসব নামসর্বস্ব অভিযানে নিয়ন্ত্রণে আসছে না মশা।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নাগরিক সেবা নিয়ে সিটি করপোরেশনের নজর নেই। মেয়র ও নগর ভবনের কর্মকর্তারা আন্তরিক হলে মশক পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছত না। ছয় মাস সঠিকভাবে মশার ওষুধ ছিটালে হয়তো নিয়ন্ত্রণে আনা যেত। কিন্তু কাজ না করে তারা অপেক্ষা করছেন প্রকৃতির। কখন ঝড়-বৃষ্টি হবে আর মশার লার্ভা প্রবহমান পানিতে ধুয়ে যাবে। রাজধানীর পল্লবীর বাসিন্দা সুরাইয়া আলম বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘সন্ধ্যার আগেই বাসার দরজা-জানালা বন্ধ করা হয়। কিন্তু এর পরও মশার কামড় থেকে রক্ষা নেই। ছেলেমেয়েরা পড়তে বসলে মশার কামড়ে হাত, পা, মুখে রক্তবিন্দু জমে থাকে। রান্নাঘরে কাজ করতে গেলে কানের পাশে ভোঁ ভোঁ করে মশা। মশা মারতে কয়েল, স্প্রে, বৈদ্যুতিক ব্যাট সবই কিনেছি। কিন্তু কিছুতেই মশার কামড় থেকে নিস্তার পাচ্ছি না।
শুধু পল্লবী নয়, অভিজাত গুলশান, বনানী থেকে শুরু করে উত্তরা, খিলক্ষেত, নিকেতন, মোহাম্মদপুর, মিরপুর, মহাখালী, ফার্মগেট, শাহবাগ, ধানমন্ডি, গুলিস্তান, ওয়ারী, যাত্রাবাড়ী সব এলাকার পরিস্থিতি প্রায় একই। শীত এলেই বেড়ে যায় কিউলেক্স মশার প্রকোপ। এর মধ্যে রয়েছে এডিস মশার কামড়। এসব মশার কামড়ে ডেঙ্গুজ্বর, চিকুনগুনিয়াসহ বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হচ্ছে মানুষ। স্বাস্থ্য অধিদফতরের হেলথ ইমারজেন্সি অপারেশন সেন্টার ও কন্ট্রোল রুম সূত্রে জানা যায়, এ বছর গতকাল পর্যন্ত ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়েছেন ৪২ জন। গত বছর ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়েছিলেন ১ হাজার ৪০৫ জন। এর মধ্যে মারা গেছেন সাতজন।
রাজধানীর কলাবাগানের বাসিন্দা সাব্বির হোসেন বলেন, ‘মশার কামড়ে বাড়িতে অতিষ্ঠ অবস্থা। মশারি টানিয়ে ঘুমালেও শান্তি নেই। মশারির ফাঁক গলে ঢুকে পড়া মশা মারতে গিয়ে রাতের ঘুম নষ্ট হয়।’ গুলশান-২ এলাকার বাসিন্দা আফরোজা শাহিন বলেন, ‘শীতের শুরু থেকেই মশার উপদ্রব বেড়ে গেছে। এ এলাকার আশপাশে খাল, নালার বদ্ধ পানিতে মশার বংশবিস্তার বেড়েছে। মশা নিয়ে খুব ভয়ে আছি। মশা নিধনে সিটি করপোরেশনের কার্যক্রম বাড়াতে হবে। অনিয়মিতভাবে ধোঁয়া দিয়ে মশা তাড়ানো সম্ভব নয়।’ গুলশান সোসাইটির কোষাধ্যক্ষ আবদুল্লাহ আল জহির স্বপন বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘সন্ধ্যার পর মশার উপস্থিতি বেড়ে যায়। সিটি করপোরেশনের মশার ওষুধ কাজ করলে এ অবস্থা হওয়ার কথা নয়। মশা কামড়ালেই এখন ডেঙ্গু, চিকুনগুনিয়ার ভয় হয়।’
মোহাম্মদপুরের মুদিদোকানি লিয়াকত আলী বলেন, ‘খালের পানিতে তাকালে যে পরিমাণ মশার লার্ভা দেখি তাতে মশার কামড়ানো স্বাভাবিক। এসব খাল পরিষ্কার করে ওষুধ ছিটালে মশার কামড় থেকে এলাকাবাসী রক্ষা পেত। মশার কামড়ে দোকানে দাঁড়িয়ে থাকা কঠিন। কয়েল, স্প্রে দিলেও মশা কমে না। মাঝেমধ্যে সন্ধ্যার আগে কাঁধে মেশিন নিয়ে এসে সিটি করপোরেশনের লোকজন ধোঁয়া দিয়ে যায়। এতে মশা কমার বদলে মনে হয় যেন আরও বাড়ে।’
স্বাস্থ্য অধিদফতরের প্রধান কীটতত্ত্ববিদ খলিলুর রহমান বলেন, গত মাসে রোগনিয়ন্ত্রণ শাখার জাতীয় ম্যালেরিয়া নির্মূল ও এডিসবাহিত রোগনিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির আওতায় জরিপ পরিচালিত হয়েছে। সেখানে এডিস মশার ঘনত্ব অনেক কম পাওয়া গেছে। এ সময় খালে পানিপ্রবাহ কমে যাওয়ায় বদ্ধ পানিতে কিউলেক্স মশা বংশবিস্তার করে। খোলা ড্রেন নিয়মিত পরিষ্কার না করলে সেখানে মশার বংশবিস্তারের পরিবেশ তৈরি হয়। সিটি করপোরেশন এসব ময়লা পরিষ্কার করে ওষুধ স্প্রে করলে মশার বংশবিস্তার কমে আসবে।
২০ ফেব্রুয়ারি থেকে মশক নিধনে সপ্তাহব্যাপী বিশেষ অভিযান চালিয়েছে ডিএনসিসি। অভিযানে ২১০টি স্থাপনায় লার্ভা পাওয়া যায়। ৩০ হাজার ১২৯টি প্রজননস্থল ধ্বংস করে কীটনাশক দেওয়া হয়েছে। মশার লার্ভা ও বংশবিস্তার উপযোগী পরিবেশ পাওয়া এবং অন্যান্য অপরাধে ৮৯টি মামলায় মোট ১০ লাখ ৮২ হাজার ৩০০ টাকা জরিমানা আদায় করা হয়েছে। কিন্তু অভিযানের পরও মশার হাত থেকে রেহাই মেলেনি নগরবাসীর।
৮ থেকে ১৬ মার্চ পর্যন্ত কিউলেক্স মশা নিধনে ক্র্যাশ প্রোগ্রাম চালানো হবে জানিয়েছে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন। এ প্রোগ্রামে উত্তর সিটির ১০টি অঞ্চলের সব নিধন কর্মী এবং যান-যন্ত্রপাতি একটি অঞ্চলে নিয়ে এক দিন করে মশক নিধন অভিযান পরিচালনা করা হবে। উত্তর সিটির মেয়র মো. আতিকুল ইসলাম গতকাল রাওয়া ক্লাবে অনুষ্ঠিত পঞ্চম করপোরেশন সভায় এ পরিকল্পনার কথা জানান। তিনি বলেন, ‘কিউলেক্স মশা নিধনে আমরা “ইনটেনসিভলি” কাজ করব। মশক নিধনের পাশাপাশি পরিচ্ছন্নতা অভিযানও পরিচালিত হবে। সমগ্র ঢাকা উত্তরকে আমরা সম্পূর্ণ “সুইপিং” করতে চাই।
প্রকাশক ও সম্পাদক : ফয়সাল হাওলাদার।
Copyright © 2026 মেহেন্দিগঞ্জ টাইমস ।। Mehendiganj Times. All rights reserved.